খুলনা মহানগর এলাকায় মাত্র ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে গুলি করে এক যুবক এবং এক গৃহবধূকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বর্তমানে খতিয়ে দেখছে যে, এই দুটি পৃথক ঘটনার মধ্যে কোনো গোপন যোগসূত্র রয়েছে কি না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, মাদক ব্যবসার অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড দুটি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। এর পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকেও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে নগরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম তুষার (৩২) নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর একই দিন সন্ধ্যার পর জিন্নাহপাড়া এলাকায় খুশি (২৫) নামের এক গৃহবধূকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এই দুই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে এজাহার দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পরিবারের সদস্যরা আজ শুক্রবার আসার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা না এলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করতে পারে।”
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, দুটি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ নিবিড়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে। কারা এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে, সে বিষয়ে মোটামুটি কিছু তথ্য পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দুটি খুনের ঘটনার মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। জানা গেছে, সকালে নিহত তাওহিদুল ইসলাম নগরের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ গ্রুপের সদস্য ছিলেন। এই গ্রুপটি আরেক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গ্রেনেড বাবু গ্রুপের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, সন্ধ্যায় নিহত খুশি বাবু গ্রুপের হয়ে মাদক বিক্রি করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এই বিপরীতমুখী সম্পর্কের কারণে দুটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
তবে খুশির পরিবারের দাবি, তাঁরা মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। এই দাবিটি সামনে আসায় পুলিশ এখন যাচাই করছে যে, মাদক ব্যবসা ছেড়ে দেওয়া, বাবু গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে অন্য কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা কিংবা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে বিরোধের জেরে খুশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কি না।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় বি-কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ ও টেংকি শাওন গ্রুপের নাম আলোচনায় এসেছে। এসব অপরাধী গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্রবণতাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে।
তদন্তকারী সূত্র আরও জানিয়েছে, খুশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে ওই এলাকায় মাদক বেচাকেনা নিয়ে আশিক গ্রুপ ও বাবু গ্রুপের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডে আশিক গ্রুপের কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অন্যতম বিষয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে খুলনা মহানগরে মোট ৩৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও উল্লেখ করেছে যে, খুশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলের পাশেই আশিকের বোনের বাসা। খুনের কিছু সময় পর একদল লোক ওই বাসায় ঢুকে টেলিভিশন ও কিছু আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। ধারণা করা হচ্ছে, আশিক গ্রুপকে দায়ী করে এই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এর বিপরীত সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না; অর্থাৎ আশিক গ্রুপকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে বাবু গ্রুপের সদস্যরাও ওই বাসায় হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।