বিএনপি সরকার গঠনের পর আট মাস অতিক্রান্ত হলেও দুর্নীতি দমনের ব্যাপারে জোরালো কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ আমলের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সূচকে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে প্রথমবার শীর্ষে আসে। সে বছর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্তও দুর্নীতিতে একই অবস্থানে থাকে বাংলাদেশ। বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতি গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) কান্ট্রি র‍্যাঙ্কিংয়ে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের এ অবস্থান প্রকাশ পেয়েছিল।

২০০৭ সালে সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী দমন কার্যক্রম গ্রহণের কারণে দেশে-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। ২০০৭-০৮ মেয়াদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকালে দুর্নীতি দমন কমিশন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করায় বাংলাদেশও পাঁচ বছরের ওই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে সাময়িক মুক্তি লাভ করেছিল। দুঃখজনকভাবে, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি দমন কমিশনকে পরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করার পদক্ষেপ নেওয়ায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ভূমিকা আবার দুর্বল হয়ে যায়।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেকগুলো সংস্কার কমিটি গঠন করে। দুর্নীতি দমন নিয়ে সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব প্রদান করা হয় ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিটিকে। যেহেতু ড. ইফতেখারুজ্জামান অনেক বছর ধরে ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ’–এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তাই আমরা খুবই আশ্বস্ত হয়েছিলাম যে তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশগুলো খুবই কার্যকর ও সাহসী প্রমাণিত হবে।

কিন্ত কিন্তু তাদের সুপারিশগুলো নিয়ে কিছুটা আশাহত হয়েছিলাম। আমার মতে, কমিটি সমস্যাটির সমাধানে খুব সাহসী সুপারিশ প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, কমিটি খুব বেশি সময় দেয়নি সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য সমস্যার গভীর বিশ্লেষণে যাওয়ায়। এতৎসত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ না নিলেও বিএনপি সরকার সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে যাবে বলে আশা করেছিলাম।

দুর্নীতি এ দেশের তুলনামূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনে ব্যর্থতার জন্য প্রধানত দায়ী। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে, আর ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রকে চরম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করে ১৯৭৫ সালে।

ভিয়েতনামের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি ১৯৭৪ সালে ছিল মাত্র ৬৫ ডলার। আইএমএফের হিসাব মোতাবেক ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপি ৪৮০৬ ডলারে পৌঁছে গেছে, যেটাকে ‘মিরাকল’ বলা হচ্ছে। বাংলাদেশে তা ২ হাজার ৬৩৫ মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালে ভিয়েতনামের মাত্র ২ শতাংশ জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। আর বাংলাদেশে ২১ শতাংশ জনগণ।

হাসিনার পতনের পর গত দুই বছরে অর্থনীতিবিদদের কাছে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে স্বৈরশাসক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ক্ষমতা না হারালেও ‘অর্থনৈতিক মেল্টডাউন’-এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারতেন না হাসিনা। এখন শুধু হাসিনার দুর্নীতির ভয়াবহতা বর্ণনা করলে প্রশ্ন উঠবে বিএনপি গত আট মাসে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে কী কী ‘কংক্রিট পদক্ষেপ’ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে?

বাংলাদেশের তুলনামূলক পশ্চাৎপদতা ও হতাশাজনক দারিদ্র্য পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী এখানকার দুর্নীতির ধারাবাহিকতা। ২০২৫ সালেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানের পর সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ২০০৯-২০২৪ শাসনামলে ব্যাংক লুট, পুঁজি-লুণ্ঠন ও পুঁজি-পাচারের সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকে একেবারেই অকার্যকর করে ফেলেছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসন হাসিনাকে সুযোগ করে দিয়েছিল লাগামহীন লুটপাট করতে।

হাসিনার শাসনামলে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় ও স্বল্প প্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পের তিন-চার গুণ বেশি ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে লাখ লাখ কোটি টাকা, যে জন্য অনেক প্রকল্পের ব্যয় ‘বিশ্বের সর্বোচ্চ’ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। হাসিনা সরকার ‘ডেটা ডক্টরিং’-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু জিডিপি প্রশংসনীয় গতিতে বাড়ার গল্প সাজিয়ে দেশটাকে লুটেপুটে ছারখার করে দিয়েছে, যে অর্থের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

এই পুঁজি-লুণ্ঠনের কেন্দ্রে ছিল শেখ পরিবার, হাসিনা পরিবার ও তাদের আত্মীয়স্বজন আর ঘনিষ্ঠরা। আর ছিল এস আলম, সালমান এফ রহমান, নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ আরও অনেক লুটেরা অলিগার্ক ব্যবসায়ী এবং হাজার হাজার লুটেরা রাজনীতিবিদ ও দুর্নীতিবাজ আমলা। শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে যে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিস্তৃত শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনামলে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

হাসিনার পতনের পর গত দুই বছরে অর্থনীতিবিদদের কাছে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে স্বৈরশাসক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ক্ষমতা না হারালেও ‘অর্থনৈতিক মেল্টডাউন’-এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারতেন না হাসিনা। এখন শুধু হাসিনার দুর্নীতির ভয়াবহতা বর্ণনা করলে প্রশ্ন উঠবে বিএনপি গত আট মাসে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে কী কী ‘কংক্রিট পদক্ষেপ’ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে?

সাধারণ জনগণ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে এখনো দুর্নীতির প্রকোপে জর্জরিত হয়ে রয়েছে। আওয়ামী লীগের স্থলাভিষিক্ত বিএনপির নেতা-কর্মীরা ব্যাপক চাঁদাবাজিতে মেতে ওঠায় আবার জনগণের নাভিশ্বাস উঠছে। ভূমিসংক্রান্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রকোপ আগের মতোই রয়ে গেছে। কাস্টমস, ভ্যাট এবং আয়কর বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে কোনো আঁচড়ই পড়েনি। বিআরটিএ অফিসে এখনো প্রতি পদক্ষেপেই দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়।

সরকারি যেকোনো অফিসেই সেবা পেতে হলে আগের মতো ঘুষ দিতে হচ্ছে। বিচার বিভাগের ঘুষ-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আগের মতোই বহাল রয়েছে। এমপি–মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠা নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে এমন খবর পত্রপত্রিকায় পাইনি। দুদক সেই অর্থে এখনো সক্রিয় নয়। দুদক নিয়ে সংস্কার থমকে আছে। কিন্তু দেশের ‘এক নম্বর সমস্যা’ দুর্নীতি, তাই দুর্নীতি দমনকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা না করাটা নিশ্চিতভাবেই বিএনপির বড় মাপের ভুল।

ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ এবং ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত লেখকের নিজস্ব