১৯ অক্টোবর রাতে আলবার্টার চৌদ্দ শর বেশি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স খোলার সময় কানাডাজুড়ে বাংলাদেশি অভিবাসীরা দুরুদুরু বুকে তাকিয়ে ছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়। অনানুষ্ঠানিক ফলাফল—কানাডা ছাড়ছে না আলবার্টা। প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোটকেন্দ্রের অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে ‘অখণ্ডতা’র পক্ষে পড়েছে ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্যবধান ৯ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। ক্যালগারি-এলবোর মতো শহুরে আসনে ‘অখণ্ডতা’ পেয়েছে ৮৫ শতাংশ ভোট। গ্রামীণ আলবার্টায় ব্যবধান তুলনামূলক কম। অভিবাসীরা গ্রামে থাকে না। ফলাফল স্পষ্ট করে দিল অভিবাসীরাই—কানাডাকে খণ্ড হতে দেবে না কখনো।

বাংলাদেশি অভিবাসীসহ প্রায় সব অভিবাসীর ভোট পড়েছে আলবার্টার বিপক্ষে। গণভোটের সপ্তাহখানেক আগে আমার এক আলবার্টান সহকর্মী প্রশ্ন করেছিলেন—বাংলাদেশিদের কাছে ১৯৭১ ন্যায্য, তাহলে আলবার্টা বা কুইবেকের স্বপ্ন কেন অন্যায্য? কানাডা হতে আলবার্টাকে বিচ্ছিন্ন দেখতে আগ্রহীরা সবাই জানে, গড়পড়তা ৯০-৯৫ শতাংশ ডায়াস্পোরা সমাজ কানাডার ভাঙনবিরোধী।

ব্যালটের দশম প্রশ্নটিই আসল, আলবার্টা কি কানাডার প্রদেশ হিসেবে থাকবে, নাকি প্রাদেশিক সরকার সংবিধান মেনে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে একটি ‘বাধ্যতামূলক’ গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে?

৩০ অক্টোবর ১৯৯৫-এ ফরাসি ভাষাভাষী কুইবেকও প্রায় স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। গণভোটে ভোট পড়েছিল ৯৪ শতাংশ। কানাডার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা রেকর্ড। আলাদা হবার বিপক্ষে ‘না’ ভোট জেতে মাত্র ৫০ দশমিক ৫৮ শতাংশ ভোটে। ‘হ্যাঁ’ হারে ৪৯ দশমিক ৪২ শতাংশ ভোটে। ব্যবধান মাত্র ৫৪ হাজার। একটি বড় স্টেডিয়ামের দর্শকসংখ্যার সমান ভোটারগোষ্ঠী প্রদেশটির আলাদা হওয়া ঠেকিয়ে দিয়েছিল। সেই রাতেই প্রিমিয়ার জাক পারিজো পরাজয়ের দায় চাপালেন অভিবাসী ভোটারদের ওপর। কানাডার অভিবাসীদের স্মৃতিতে বাক্যটি আজও কাঁটার মতো বিঁধে আছে। একজন অভিবাসী নাগরিকের ভোটকে ‘সমস্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা ডায়াস্পোরা সমাজ পছন্দ করেনি। তবে ঘটনাটি অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি বাড়ায়নি।

গণতন্ত্র সত্যিকার গণতন্ত্র হলে কতটা উপভোগ্য, আলবার্টাই তার প্রমাণ। প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ আলবার্টাকে স্বাধীন করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, গণভোট ডেকেছিলেন। ভোট শেষে নিজেই আবার অখণ্ড কানাডার ঘোষণা দিয়েছেন। গণরায়কে সম্মান জানিয়েছেন।

২

সহকর্মীর প্রশ্ন ধরেই উত্তর খুঁজব, যে জাতি নিজেই ১৯৭১ সালে রক্তের দামে স্বাধীন হয়েছে, সেই জাতির সন্তানেরা কেন আলবার্টার স্বাধীনতার বিপক্ষে?

ভোটের ফলাফলের মাঝেই উত্তর আছে। ভোটে পাঁচটি প্রশ্নই ছিল অভিবাসন-সংক্রান্ত। পাঁচটিই পাস করেছে ৫৪ থেকে ৬৪ শতাংশ সমর্থনে। প্রদেশের হাতে অভিবাসনের নিয়ন্ত্রণ; প্রাদেশিক অর্থায়নে চলা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবা কেবল নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা ও আলবার্টা-অনুমোদিত মর্যাদাধারীদের জন্য সীমিত করা, অস্থায়ী মর্যাদার মানুষের কাছ থেকে সেবার ফি নেওয়া ইত্যাদি বৈষম্যমূলক চাওয়া জিতেছে। আসলে অ-অভিবাসীদের প্রায় শতভাগ ভোটই পড়েছে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পক্ষে।

নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো মানুষটি জানে ভাঙনের শব্দ কতটা বিধ্বংসী। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-স্বজনের মায়া ছেড়ে নতুন মাটিতে আশ্রয় নেওয়া মানুষটি চায় না নতুন মাটিতেও ফাটল ধরুক। ১৯৭১ সালে বিহারিরা একই অনুভূতির কারণে পাকিস্তানের ভাঙনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। মাতৃভূমির মাটির গন্ধ আর মায়ের মতো জন্মস্থানের মায়ার বাঁধন ভেঙে শূন্য হয়ে ভিনদেশে এসেছিল আরেকবার শূন্য হয়ে যেতে নয়।

দুই. সহকর্মীর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছি অ্যালেন বুকাননের সেসেশন: দ্য মোরালিটি অব পলিটিক্যাল ডিভোর্স বইয়ে। বুকানন ‘প্রতিকারমূলক বিচ্ছিন্নতা’ ধারণা দ্বারা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। বিচ্ছিন্ন হওয়ার নৈতিক অধিকার জন্মায় কেবল গুরুতর অবিচারের প্রতিকার হিসেবে—গণহত্যা, পরিকল্পিত বৈষম্য, রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের পূর্ণ অস্বীকৃতি ইত্যাদিতে। ১৯৯৮ সালে কানাডার সুপ্রিম কোর্টও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যায় প্রায় একই কথা বলেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার উপনিবেশাধীন বা নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর, যারা রাষ্ট্রের ভেতরে ন্যায্য আত্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগবঞ্চিত।

বাংলাদেশ বুকাননের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। বায়ান্নয় মাতৃভাষার অস্বীকৃতি, সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জনরায় পদদলিত করা, ২৫ মার্চের কালরাত আর ৯ মাসের গণহত্যা—এসবের পর স্বাধীনতাই ছিল একমাত্র উপায়। আলবার্টার নিজস্ব আইনসভা, সম্পদের ওপর সাংবিধানিক মালিকানা, অটোয়ায় পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব—সবই আছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই এডমন্টনে বেড়ে ওঠা মানুষ। কুইবেকের আছে ফরাসি ভাষার সাংবিধানিক সুরক্ষা, নিজস্ব অভিবাসন চুক্তি, নিজস্ব দেওয়ানি আইন। অভিমান আছে, অবিচারের অভিযোগও আছে। কিন্তু অমানবিকতা বা শোষণ-বঞ্চনা নেই।

তিন. অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের মতো বাংলাদেশি অভিবাসীদের যুক্তিও একই: আমরা যে শপথ নিয়েছি, তা কানাডার প্রতি। আমাদের পাসপোর্ট কানাডার। ইমিগ্রেশন, স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা, শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীর অনুমতিপত্র, সবই ফেডারেল এখতিয়ারের বিষয়। চার্টারের ৬ নম্বর ধারা আমাদের দিয়েছে সারা দেশে বসবাস ও কাজের অধিকার। স্বাধীন আলবার্টা বা কুইবেকে সবকিছু হঠাৎ অনিশ্চয়তা ও শূন্যতায় পড়ত।

চার. আলবার্টার এক স্বাধীনতাপন্থী ‘আলবার্টান নাগরিকত্ব’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘গণভোটে জেতাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে’ নাগরিকত্ব নির্ধারিত হবে। এডমন্টনের অভিবাসন আইনজীবী অভনীশ নন্দা তাই সতর্ক করেছিলেন, আলবার্টা স্বাধীন হলে নতুন নাগরিকদের স্বাধীনতা ও মর্যাদার কোনো গ্যারান্টি নেই। অভিবাসীদের যাঁরা একবার দেশ ছেড়ে, ভাষা ছেড়ে, পেশার স্বীকৃতি হারিয়ে শূন্য থেকে শুরু করেছেন, তাঁরা দ্বিতীয়বার ‘শূন্য’ হবার ঝুঁকি নেবেন না—এটিই স্বাভাবিক।

পাঁচ. অভিবাসীদের ‘না’ ভোটের আরেকটি কারণ ছিল অভিবাসন সীমিত হবার ভয়। অভিবাসন সীমিত করার বিষয়ে গণভোটের পাঁচটি প্রশ্নই প্রমাণ। ‘বহিরাগত’ চিহ্নিতকরণের রাজনীতিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট কেন দেবে ডায়াস্পোরা সমাজ?

ছয়. ১৯৭১ সালেরই ৮ অক্টোবর পিয়ের ট্রুডো কানাডায় ‘বহুসংস্কৃতিবাদ’কে রাষ্ট্রীয় নীতি ঘোষণা করেন। পরে চার্টারের ২৭ নম্বর ধারা আর ১৯৮৮ সালের বহুসংস্কৃতিবাদ আইন সেটিকে সাংবিধানিক ভিত দেয়। এই মডেল সংখ্যালঘু অধিকার আর উদার গণতন্ত্রকে একসঙ্গে ধরে রাখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে পশ্চিমা বিশ্বের সবার আগে সোচ্চার হয়েছিলেন পিয়েরে ট্রুডো। বাংলাদেশি অভিবাসীরা আত্মিক মনস্তাত্ত্বিক কৃতজ্ঞতায় ‘কানাডা’কে ভালোবাসেন। তাঁদের চোখে প্রদেশগুলো ভাই–ভাই, আলাদা হবে কেন?

সাত. বাংলাদেশি অভিবাসীরা বিষয়টিকে দেখেছেন ঝড়ের মধ্যে নৌকা করাত দিয়ে কেটে ভাগ করার অবস্থা হিসেবে। মার্কিন শুল্কযুদ্ধ, কানাডাকে ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর হুমকি, আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের ঘনিষ্ঠদের যোগাযোগ প্রমাণ করে বিচ্ছিন্নতা অভিবাসীদের আশ্রয়ের জায়গা সংকুচিত করবে। অভিবাসীদের চোখে বিপজ্জনক সময়ে দেশের ভেতরে নতুন ফাটল মানে চোরের হাতে ঘরের চাবি দেওয়া।

৩

প্রদেশটিতে ক্ষোভের শুরু ১৯৮০ সালে, পিয়ের ট্রুডোর ‘ন্যাশনাল এনার্জি প্রোগ্রাম’–এর কারণে। আলবার্টার তেলসম্পদের ওপর অটোয়ার কর্তৃত্বের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৮২ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘ওয়েস্টার্ন কানাডা কনসেপ্ট’ দলের গর্ডন কেসলার ওল্ডস-ডিডসবারি উপনির্বাচনে জিতে যান। তারপর নানা উত্থান-পতন ও পক্ষ-বিপক্ষপন্থার জন্ম হয়েছে।

বিচ্ছিন্নতাকামী পাঁচ লাখ নাগরিকের রায়ও সমান যৌক্তিক। কানাডার অর্থনীতিতে প্রদেশটির অবদান শীর্ষে। কিন্তু অবদানের সুফল ব্যবহৃত হয় পিছিয়ে পড়া প্রদেশগুলোর উন্নয়নে। ১৯৬৫ সালের পর থেকে ধনী প্রদেশ আলবার্টা ফেডারেল সমতাসাধন তহবিল থেকে কোনো সুবিধা পায়নি। অথচ দশকের পর দশক কানাডার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। পাইপলাইন, কার্বননীতি, জ্বালানি খাত—সবকিছুতেই প্রদেশটি অটোয়ার হস্তক্ষেপের অধীন। বিচ্ছিন্নতাকামী আলবার্টানদের পরাজয়ের পর অভিবাসনবিরোধিতা কি বাড়বে? প্রশ্নটির উত্তর শুধু সময়ই দিতে পারবে। তবে ইতিহাসের পরম্পরা বিশ্লেষণ করে বিশ্বাস রাখা যায়, অভিবাসনবিরোধিতা কানাডায় কখনোই দুশ্চিন্তার কারণ হবে না। কানাডা সাংবিধানিকভাবেই শুধু নয়, চর্চায়ও পৃথিবীসেরা মানবিক দেশ। দেশটিতে মানবিকতার জয়ই হয় সবকিছুর আগে।

হেলাল মহিউদ্দীন শিক্ষক, লিবারেল আর্টস, মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থ ডাকোটা, যুক্তরাষ্ট্র

মতামত লেখকের নিজস্ব