চীনের প্রত্যন্ত তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৪৬ জন। অন্যদিকে, দেশটির স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তাইওয়ানের দিকে ধেয়ে আসা সুপার টাইফুন ‘চ্যাম্পি’র প্রভাবে এখন পর্যন্ত একজন নিহত এবং ৯৪ জন আহত হয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে তিব্বত অঞ্চলে এই ভয়াবহ ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে তিন শতাধিক বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে অথবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণের পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তিব্বতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি স্থানীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে ১১ জনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। ভূমিকম্পের তীব্রতায় মোট ৩৩৯টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়েছে।
সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর ভেতরে তল্লাশি চালাচ্ছেন। বেশ কিছু ভবনের ছাদ ধসে পড়তে দেখা গেছে। ফুটেজে এক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে এবং উদ্ধারকর্মীরা টর্চের আলো ব্যবহার করে অন্যান্য ভবনে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
সিসিটিভিতে প্রচারিত ভিডিওতে আরও দেখা গেছে, ভূমিকম্পের কম্পন শুরু হতেই রেস্তোরাঁ থেকে কর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসছেন। সুপারমার্কেটের তাক থেকে বিভিন্ন পণ্য নিচে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যও ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল পার্বত্য এলাকায়। এটি নাগচু শহরের প্রায় ১৯০ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর-পূর্বে এবং তিব্বতের রাজধানী লাসা থেকে ৩৯০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে।
সিসিটিভির খবরে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল বাকেন কাউন্টির মারু টাউনশিপের উপপ্রধান লাওয়াং দাগপো জানিয়েছেন, “টাউনশিপ কার্যালয়ে ভূমিকম্পের কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। এ ঘটনায় কার্যালয়ের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে।”
সিনহুয়ার প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ভূমিকম্পের প্রভাবে কাউন্টির প্রশাসনিক কেন্দ্রে বিদ্যুৎ সংযোগ ও টেলিযোগাযোগ সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সহায়তার জন্য তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বাহিনীর ৩৪৭ জন কর্মীকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
আজ শুক্রবার জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়টি তাইওয়ানের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থান করছিল। সরাসরি আঘাত হানার প্রবল আশঙ্কা থাকায় ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের সতর্কবার্তার কারণে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে তাইওয়ান। ইতোমধ্যে ৯৩১টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছেন। কয়েকটি ভবনের ছাদ ধসে পড়েছে। এক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় নিয়ে যেতে দেখা যায়। অন্য ভবনগুলোতে টর্চের আলো দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। পাশাপাশি সেনাসদস্যদেরও মোতায়েনের প্রস্তুতি নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
চীনে প্রায়ই ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিব্বতের প্রত্যন্ত তিংরি কাউন্টিতে ভূমিকম্পে অন্তত ১২৬ জন নিহত হন। এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গানসু প্রদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ভূমিকম্পে অন্তত ১২৭ জন নিহত হন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল। ২০১৪ সালের পর সেটিই ছিল চীনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প। ওই বছর দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশে ভূমিকম্পে ছয় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০০৮ সালে সিচুয়ান প্রদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন, যাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার স্কুলশিক্ষার্থী ছিল।
তাইওয়ানে ধেয়ে যাচ্ছে টাইফুন
এদিকে তাইওয়ানের দিকে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী টাইফুন ‘চ্যাম্পি’। এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে এখন পর্যন্ত ১ জন নিহত ও ৯৪ জন আহত হয়েছেন। শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৯১ কিলোমিটার। পাহাড়ী এলাকা থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আজ শুক্রবার ঘূর্ণিঝড়টি তাইওয়ানের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থান করছিল। সরাসরি আঘাত হানার আশঙ্কা থাকায় ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসের সতর্কতার মধ্যে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে তাইওয়ান। বাতিল করা হয়েছে ৯৩১টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।
সুপার টাইফুনে পরিণত হওয়া ‘চ্যাম্পি’ এ বছর প্রশান্ত মহাসাগরে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ঝড়গুলোর একটি। তাইওয়ানের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া প্রশাসন (সিডব্লিউএ) জানিয়েছে, ঝড়টির বাতাসের বিস্তৃতি প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। এ কারণে দ্বীপটির অধিকাংশ এলাকায় এর প্রভাব পড়তে পারে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, চ্যাম্পি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে উত্তর দিকে চীনের মূল ভূখণ্ডের দিকে যাবে এবং পরে দক্ষিণ জাপানের দিকে এগিয়ে যাবে। তবে ঝড়টির গতিপথ পরিবর্তন হলে তাইওয়ানে সরাসরি আঘাত হানার আশঙ্কাও রয়েছে।
ঝড়ের সতর্কতায় আজ তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ ২৬২টি ফ্লাইটের সব কয়টি এবং আন্তর্জাতিক ৬৬৯টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। দেশটির আর্থিক বাজারও বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলাচলকারী উচ্চগতির রেলসেবা স্বাভাবিক রয়েছে।
উপকূলীয় শহরগুলোতে মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারের বেশি বেগে বাতাসের ঝাপটার আশঙ্কার কথা জানিয়ে বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চ্যাম্পির প্রভাব প্রায় দুই দিন স্থায়ী হতে পারে। তাইওয়ান সাধারণত টাইফুন মোকাবিলায় ভালো প্রস্তুতি রাখে, যার ফলে এমন ঝড়ে প্রাণহানি তুলনামূলক কম হয়। গ্রীষ্মকালে টাইফুন বেশি দেখা গেলেও শরতেও এ ধরনের ঝড় আঘাত হানতে পারে।