বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল যোগাযোগের এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটেছে, যার ফলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ এখন কোনো না কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এই ব্যবহারকারীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭৯ কোটিতে। একজন নিয়মিত ব্যবহারকারী প্রতি মাসে গড়ে ছয়টির বেশি ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকছেন। মার্কিন সাময়িকী ‘ফোর্বস’–এর ব্যবসা ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘ফোর্বস অ্যাডভাইজার’-এর এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে।

উক্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি গড়ে সপ্তাহে ১৮ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট সময় কাটাচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক গড়ে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এই ব্যয় করা সময়কে একত্রে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই চলে যাচ্ছে ১ হাজার ৫০০ কোটি (১৫ বিলিয়ন) ঘণ্টার বেশি সময়।

ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো এককভাবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ মিলিয়ে মেটার দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫৬ কোটিতে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি।

ব্যবসায়িক দিক থেকেও মেটার রাজস্বে লক্ষণীয় বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞাপননির্ভর আয় আগের বছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারে, অন্যদিকে বিজ্ঞাপনপ্রতি গড় খরচও বেড়েছে ১২ শতাংশ। ব্যবহার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ফেসবুকের ওয়াচ টাইম বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি, যা বিগত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রান্তিকভিত্তিক প্রবৃদ্ধি। পাশাপাশি অ্যালগরিদম ও র‍্যাঙ্কিং পরিবর্তনের ফলে ইনস্টাগ্রাম রিলসে কাটানো সময় বেড়েছে ১০ শতাংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত এগোচ্ছে; বর্তমানে মেটার ৮০ লাখের বেশি বিজ্ঞাপনদাতা অন্তত একটি এআই বিজ্ঞাপন টুল ব্যবহার করছেন।

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক নাগাদ স্ন্যাপচ্যাটের দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৪৮ কোটি ৩০ লাখে, যা বার্ষিক ভিত্তিতে ৫ শতাংশ বেশি। প্ল্যাটফর্মটির মাসভিত্তিক সক্রিয় ব্যবহারকারী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ কোটি ৬০ লাখে।

স্ন্যাপচ্যাটের আয়ও প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৩ কোটি ডলারে। অন্যদিকে ব্যবহারকারী ও রাজস্ব বৃদ্ধির হারে চমক দেখিয়েছে অনলাইন ফোরামভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম রেডিট। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর ১৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৬৮ লাখে। একই সময়ে রেডিটের রাজস্ব ৬৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। এর মধ্যে প্ল্যাটফর্মটির শুধু বিজ্ঞাপন থেকেই আয় হয়েছে ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি।

বিনোদন ও কনটেন্ট পাওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষের নির্ভরতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষণকারী সংস্থা ডেলয়েটের তথ্যমতে, বিভিন্ন শো, শিল্পী বা কনটেন্টের নিয়মিত ভক্তদের ৫২ শতাংশই জানিয়েছেন, “তহাদের কাছে নতুন কোনো টিভি শো, সিনেমা, গান, গেম বা ইভেন্ট সম্পর্কে জানার মূল মাধ্যম এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।” তরুণ প্রজন্ম, অর্থাৎ জেন-জির ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি; প্রায় ৭৩ শতাংশ।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিষয় পছন্দ হলেও কেনাকাটা বা দেখার জন্য দর্শক পুরোপুরি সেখানে সীমাবদ্ধ থাকছেন না। সমীক্ষায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কোনো কনটেন্ট বা পণ্যের সন্ধান পাওয়ার পর প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ সেটি দেখতে বা কিনতে অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে চলে যায়, বিশেষ করে সেই পণ্যের নিজস্ব ওয়েবসাইটে।

জেন-জির ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়লেও তা সরাসরি প্ল্যাটফর্মের ভেতর বিক্রিতে রূপান্তর করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।