কিছু কিছু মৃত্যু অযাচিতভাবে হানা দেয়। একদিন টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখলাম, সৈয়দ আবুল মকসুদ আর নেই। তরতাজা মানুষটা হঠাৎ করেই ‘নেই’ হয়ে গেলেন। তখন করোনাকাল। জানতে পারলাম, দুদিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। তারপর সব শেষ।

তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। বড়জোর সাত-আট বছরের। একই পত্রিকায় কলাম লিখি। একসঙ্গে টক শো করি। কাছাকাছি বাসা। তাই আসা-যাওয়া প্রায়ই হয় এক গাড়িতে। গাড়িতে বসে অনেক কথা হয়, যেগুলো টেলিভিশনে বলা যায় না, পত্রিকায় লেখা যায় না। আমি মানুষটাকে নতুন করে আবিষ্কার করি।

একবার একটা টক শো করে ফিরছি। রাত নয়টা পেরিয়ে গেছে। গুলশান ২ নম্বরে চৌরাস্তার ট্রাফিক সিগন্যালে আটকা পড়েছি। দায়িত্বরত এক ট্রাফিক কনস্টেবল দৌড়ে এসে জানালার কাচে টোকা দিলেন। মকসুদ ভাই কাচ নামালেন। কনস্টেবল সালাম দিয়ে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।’

মকসুদ ভাই প্রতিবাদের প্রতীকী ভাষা হিসেবে পোশাকটা নিয়েছিলেন। এ রকম আর কেউ ছিলেন না এ শহরে। ফলে তাঁকে সহজেই চেনা যেত। সমস্যা হলো, পোশাকে পকেট নেই। টাকাপয়সা বা মোবাইল ফোন রাখা যায় না। মকসুদ ভাই ‘কপর্দকহীন’ অবস্থায় চলাফেরা করতেন।

মকসুদ ভাইয়ের ছিল ‘সিগনেচার পোশাক’। সারা শরীর সাদা কাপড়ে মোড়া। আমরা অনেকেই কৌতুক করে বলি, কাফনের কাপড়। সেই কাফন যে এত তাড়াতাড়ি তাঁর শরীরে উঠবে, ভাবিনি।

একদিন তাঁকে বললাম, ভাবছি, আমিও এ রকম পোশাক পরব। তবে সাদা নয়। সাদা হলে সবাই ভাববে আপনাকে নকল করছি। আমি পরব গেরুয়া।

বললেন, ‘এ কাজ করবেন না। খুব গরম লাগে। আমি তো আর এখন এটা ছাড়তে পারছি না।’

মকসুদ ভাই প্রতিবাদের প্রতীকী ভাষা হিসেবে পোশাকটা নিয়েছিলেন। এ রকম আর কেউ ছিলেন না এ শহরে। ফলে তাঁকে সহজেই চেনা যেত। সমস্যা হলো, পোশাকে পকেট নেই। টাকাপয়সা বা মোবাইল ফোন রাখা যায় না। মকসুদ ভাই ‘কপর্দকহীন’ অবস্থায় চলাফেরা করতেন।

আমি নতুন লেখক। সবে একটা বই বেরিয়েছে। বইটা ‘হিট’ হয়েছে। তখন একুশে বইমেলা চলছে। দুরু দুরু বুকে গিয়ে প্রকাশকের স্টলে বসলাম। কেউ আমাকে চেনে না। মকসুদ ভাই বললেন, বসেন। সামনে পাঠকের লম্বা লাইন। তাঁরা বই কিনছেন। সবাই মকসুদ ভাইয়ের অটোগ্রাফ চান। কিন্তু বই কিনছেন আমারটা। আমাকে তো কেউ চেনে না! মকসুদ ভাই আমার লেখা বইয়ে নির্বিকার চিত্তে অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছেন। হেসে বললেন, ‘এত বছর ধরে লিখছি। কিছুই করতে পারলাম না। অথচ এক বইয়েই আপনি মাত করে দিলেন!’

আমি লজ্জা পেলাম। এক রাতে টক শো করে এক গাড়িতে বাসায় ফিরছি। সরাসরি বাসায় না গিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন কলাবাগানের একটা বাড়িতে। দোতলায় উঠে একটা কামরায় ঢুকলেন। দেখি, দেয়ালের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি বুকশেলফ। তাতে অনেক বই। মকসুদ ভাই বললেন, ‘একটা পাঠাগার বানানোর চেষ্টা করছি। পারলে কিছু বই দিয়েন।’

২

একটা কথা চাউর হয়েছিল যে মাওলানা ভাসানী পঁচাত্তরের আগস্ট অভ্যুত্থানকে সমর্থন করে ঢাকায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। এটি প্রচার করে অভ্যুত্থানকারীরা ভাসানীর কাঁধে বন্দুক রেখে তাঁদের কাজের ন্যায্যতা খুঁজেছিলেন। আমি যখন ভাসানীকে নিয়ে লিখতে শুরু করি, তখন তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জানি আপনি মাওলানার ভক্ত। তিনি এমন কাজ করতে পারলেন?

মকসুদ ভাই বললেন, ‘প্রচারটি সর্বৈব মিথ্যা। মাওলানা তখন টাঙ্গাইলের সন্তোষে, অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তিনি কোথা থেকে কার কাছে করলেন? আমি তো বাসসের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছি। এ সংবাদ তো বাসস থেকে যায়নি। এই টেলিগ্রামের গল্প অভ্যুত্থানকারীরা বঙ্গভবনে বসে বানিয়েছে। পত্রিকা সেসব ছেপেছে।’

তিনি সাংবাদিকতাকে জীবনের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরে আবদ্ধ না থেকে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন গবেষক-লেখক হিসেবে। তাঁর কলমের প্রধান শক্তি ছিল তথ্য, যুক্তি ও ইতিহাস-সচেতনতা। তাঁর কলামে থাকত সমাজের অসংগতি নিয়ে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ ও স্যাটায়ার।

৩

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের পরিচয় কোনো একটি পেশা বা পরিচয়ের মধ্যে আটকে নেই। তাঁরা একই সঙ্গে লেখক, গবেষক, চিন্তক, সমাজবীক্ষক ও সময়ের বিবেক। সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রকৃতির মানুষ। তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়—সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, গবেষক। কিন্তু এসব পরিচয়ের চেয়েও বড় ছিল তাঁর সাহসী মন এবং সত্যসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি। সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির জটিল প্রশ্নগুলোকে তিনি সহজ অথচ গভীর ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি সাংবাদিকতাকে জীবনের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরে আবদ্ধ না থেকে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন গবেষক-লেখক হিসেবে। তাঁর কলমের প্রধান শক্তি ছিল তথ্য, যুক্তি ও ইতিহাস-সচেতনতা। তাঁর কলামে থাকত সমাজের অসংগতি নিয়ে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ ও স্যাটায়ার।

মানিকগঞ্জের নিভৃত গ্রামে তাঁর জন্ম। নদী, মাঠ, বৃক্ষ আর বাংলার জনজীবনের যে সহজ সৌন্দর্যের মধ্যেই শৈশবে তিনি দেশ ও মানুষের প্রতি এক অন্তর্গত টান অনুভব করেছিলেন, শিকড়ের সেই মাটি কোনো দিন তাঁর সত্তা থেকে আলাদা হয়নি।

বাংলা ভাষায় গবেষণাধর্মী রচনার ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল মকসুদ একটি স্বতন্ত্র ধারা নির্মাণ করেছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, মোহনদাস গান্ধী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মাওলানা ভাসানী, স্যার সলিমুল্লাহসহ অনেক ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণা কেবল তথ্যের সমাবেশ নয়, ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা। বিশেষত মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে তাঁর কাজ বাংলা ভাষার রাজনৈতিক জীবনী সাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তিনি ভাসানীকে কোনো পৌরাণিক নায়ক হিসেবে তুলে ধরেননি; বরং একজন রাজনৈতিক নেতা, গণমানুষের প্রতিনিধি এবং ইতিহাস নির্মাতারূপে দেখিয়েছেন।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার প্রশংসা করা নয়; বরং সত্যকে অনুসরণ করা, তা যত অপ্রিয়ই হোক না কেন।

৪

একজন লেখকের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তাঁর সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর সময়কে শুধু দেখেননি, প্রশ্নও করেছেন। তিনি ছিলেন সেই বিরল কণ্ঠস্বর, যিনি সমাজের প্রচলিত ভ্রম ও আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তাঁর কলামগুলোতে তাই দেখা যায় নীরব প্রতিবাদ, নৈতিক ক্ষোভ এবং যুক্তিসম্মত বিশ্লেষণের এক অনন্য সমন্বয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, বুদ্ধিজীবীর কাজ ক্ষমতার প্রশংসা করা নয়; বরং সত্যকে অনুসরণ করা, তা যত অপ্রিয়ই হোক না কেন।