মাগুরা জেলার সরকারি ক্রীড়া সংস্থাগুলোর কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে কেবল প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ ও প্রথম বিভাগ কাবাডি লিগ আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। তবে অত্যন্ত হতাশাজনক বিষয় হলো, গত চার বছরে জেলার চারটি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং অপর চারটি মহিলা ক্রীড়া সংস্থা কোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক খেলা আয়োজন করেনি। আড়াই বছর ধরে এসব সংস্থায় কোনো নির্বাচিত কমিটি নেই, যার ফলে স্থানীয় ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট তরুণ-যুবক এবং সংগঠকদের মধ্যে তীব্র হতাশা বিরাজ করছে।
মাগুরা জেলায় মোট ১০টি ক্রীড়া সংস্থা রয়েছে। এর মধ্যে একটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও একটি জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা। এছাড়া মাগুরা সদর উপজেলা, মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর উপজেলায় একটি করে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং একটি করে উপজেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা বিদ্যমান। সর্বশেষ ২০১৯ সালে এসব সংস্থার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এরপর নির্বাচিত কমিটি চার বছর দায়িত্ব পালন করে।
নিয়ম অনুযায়ী, পদাধিকারবলে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি হন জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি হন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। অন্যদিকে, জেলা ও উপজেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী হওয়ার কথা স্থানীয় নারী ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের।
ক্রীড়া সংগঠকদের অভিযোগ, গত চার বছরে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা ও মহিলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়নি। এর ফলে পরবর্তী কার্যনির্বাহী কমিটির জন্য সাধারণ পরিষদ গঠন করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ, সংস্থা আয়োজিত টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কাউন্সিলর বা সংগঠকেরা সাধারণ পরিষদের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
জেলা পর্যায়ে ক্রিকেট লিগে অংশগ্রহণকারী শ্রীপুর সূর্যমুখী একাদশ ক্লাবের সভাপতি মো. হাসান আলী মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “২০১৬ কিংবা ১৭ সালের দিকে তৎকালীন ইউএনও শ্রীপুর উপজেলার আটটি ক্লাব নিয়ে একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিলেন। তখন সব ক্লাবকে কিছু কিছু ক্রীড়াসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। এরপর আর উপজেলা পর্যায়ে খেলাও হয়নি, ক্রীড়াসামগ্রীও পাননি।”
এই স্থবিরতা কাটাতে জেলা ও উপজেলায় অ্যাডহক কমিটি গঠন এবং নির্বাচনের জন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) অনুমোদিত স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, চার বছর মেয়াদি কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠিত হয়। ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর দেশের সব ক্রীড়া সংস্থার কার্যনির্বাহী পরিষদ বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই অ্যাডহক কমিটি বিলুপ্ত করে স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর স্থবিরতা দূর করতে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য পুনরায় অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জেলা ক্রীড়া দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এনএসসি থেকে মাগুরা সদর ও শালিখা উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার জন্য ২০২৬ সালের ৮ জুন এবং মহম্মদপুর ও শ্রীপুর উপজেলার জন্য ১২ সেপ্টেম্বর নতুন অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের অভিযোগ, এনএসসি থেকে কমিটি অনুমোদনের চিঠি প্রশাসনিক দপ্তরে পড়ে থাকলেও নবগঠিত কমিটির সদস্য বা স্থানীয় সংগঠকদের সে বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।
মাগুরা সদর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব মারুফ হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “অ্যাডহক কমিটি অনুমোদিত হয়েছে। অথচ এখনো কোনো সভা আহ্বান করেননি সভাপতি (ইউএনও)। এর ফলে নির্বাচনের প্রস্তুতি বা অন্য কোনো বিষয়ে তাঁরা অগ্রসর হতে পারছেন না।”
গতকাল বুধবার বিকেলে মাগুরা জেলা স্টেডিয়াম পরিদর্শনে দেখা যায়, মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল ও কাবাডির অনুশীলন চলছে। তবে সেই সময় জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যালয় বন্ধ ছিল। খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্রীড়া সংস্থার দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে, মাগুরা জেলা ও চারটি উপজেলার মহিলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি স্থবির। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মহিলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর কোনো অ্যাডহক কমিটিও গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিন মাগুরা জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় দায়িত্ব পালন করা সাবেক এক নারী ক্রীড়াবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা, রাজনৈতিক বিবেচনা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে এই সংস্থা ভালো কিছু করতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, “মাগুরায় মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খেলার মাঠ নেই, একটা ইনডোর স্টেডিয়াম আছে, সেখানেও খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হয়নি। এসব কারণে ভালো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জেলার বেশির ভাগ মেয়ে ঝরে পড়ে।”
স্থানীয় সংগঠকদের মতে, নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন, বার্ষিক সাধারণ সভা ও জবাবদিহির অভাবে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সারা দেশে মহিলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর অভিভাবক সংস্থা হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা। সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক শারমিন আক্তার রত্না মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “স্থবিরতা কাটাতে জেলা ও উপজেলায় অ্যাডহক কমিটি গঠন ও নির্বাচনের জন্য কয়েক মাস আগেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁদের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে কমিটি পুনর্গঠনের জন্য।” তিনি আরও জানান, সংস্থার সভাপতি মনোনয়নের বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি।
সর্বশেষ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মাগুরা জেলা ক্রীড়া সংস্থায় নির্বাচন হয়েছিল। এর চার বছর পর ২০২৪ সালের ১১ মার্চ সর্বশেষ জেলা ক্রীড়া সংস্থার বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সে সময় নির্বাচনী তফসিলও ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেই নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি। গত প্রায় সাত বছরে জেলা ক্রীড়া সংস্থা চারটি ক্রিকেট লিগ, একটি কাবাডি লিগ ও একটি বাস্কেটবল লিগ আয়োজন করেছে। যদিও বার্ষিক ক্রীড়াপঞ্জি অনুযায়ী ২০টি ইভেন্ট আয়োজনের কথা ছিল, বাস্তবে বেশির ভাগ খেলা মাঠে গড়ায় না।
উপজেলা কমিটি ছাড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন সম্ভব নয়। উপজেলা কমিটির অনুমোদনের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। অনুমোদন পেলেই জেলা কমিটির নির্বাচনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। স্থানীয় সংগঠকেরা পুনরায় উল্লেখ করেন যে, নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন, বার্ষিক সাধারণ সভা ও জবাবদিহির অভাবে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
ক্রীড়া সংস্থার একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গত ২৪ মে মাগুরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার বর্তমান অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন দেয় এবং তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দেয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন হয়নি। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক মো. দৌলতুজ্জামান খাঁন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে জেলা ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর নির্বাচন সম্পন্নের লক্ষ্যে চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যে তফসিল ঘোষণা এবং নভেম্বর মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাগুরা জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি মোতাকাব্বীর আহমেদ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “উপজেলা কমিটি ছাড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন সম্ভব নয়। উপজেলা কমিটির অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। অনুমোদন পেলেই জেলা কমিটির নির্বাচনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।” এ ছাড়া তিনি মহিলা ক্রীড়া সংস্থা পুনর্গঠনের আশ্বাস দেন।