প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছেলেদের ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেও উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের হার ৪০ শতাংশের নিচে এবং সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশের চেয়েও কম।
দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে ছাত্রীদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় বেশি। তবে উচ্চশিক্ষার স্তরে পৌঁছালে এই চিত্রটি বদলে যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলো বাদ দিলে, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের হার ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। শুধু উচ্চশিক্ষাতেই নয়, পড়াশোনা শেষ করার পর সরকারি কর্মসংস্থানেও নারীদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি; এই হার এখনো ৩০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ, শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে ছাত্রীদের যে অগ্রগতির ধারা দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে তা আর বজায় থাকছে না।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মতে, আগের তুলনায় শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিবার ও অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এবং সরকারের বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে মাধ্যমিক বা কলেজ পর্যায় পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারীদের নানা বাস্তব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। বাড়ির বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আবাসনের অভাব, যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের অভাব এবং বিয়ের চাপ—এই বিষয়গুলো অনেক মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রীদের কম অংশগ্রহণের পেছনে ঠিক কোন কারণটি কতটা দায়ী, তা বিস্তারিত গবেষণার মাধ্যমে বের করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হয়।
কর্মজীবনের ক্ষেত্রেও নারীরা বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হন। বিশেষ করে বদলিযোগ্য কর্মস্থল, দূরবর্তী এলাকায় পদায়ন, নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের অভাব এবং পারিবারিক দায়িত্ব সামলানোর মতো বিষয়গুলো নারীদের পেশাগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তবে এই বাধাগুলো সব নারীর ক্ষেত্রে এক নয়। আবার সরকারি চাকরিতে নারীর কম প্রতিনিধিত্বের কারণ কেবল পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা বদলির নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের দাবি, স্কুল-কলেজে মেয়েদের যে অগ্রগতি হয়েছে, তাকে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের পথে প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) 'বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫' অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের হার ৫১ দশমিক ২ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ে এই হার ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং কলেজ পর্যায়ে ছাত্রীদের হার প্রায় ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছাত্রী ৫৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক কলেজে ৫৩ শতাংশ।
উল্লেখ্য যে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) আওতায় ২০১৫ সালের অনেক আগেই বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাগত সমতা অর্জন করেছিল। পরবর্তী সময়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ আরও বাড়লেও উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপগুলোতে সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
প্রতিবছর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ব্যানবেইস। সংস্থাটির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থী ১১ লাখ ১৩ হাজারের বেশি। তাঁদের মধ্যে ছাত্রী মাত্র ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো ছাড়া ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিলেন সাত লাখের কিছু বেশি, যাদের মধ্যে ছাত্রী প্রায় ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ, যেখানে ছাত্রীদের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ আরও কম।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এই চিত্রে পার্থক্য দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী প্রায় ৪২ শতাংশ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর হার প্রায় ৪৯ শতাংশ। মেডিকেল ও কৃষিশিক্ষার কিছু প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক ভালো। যেমন, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৫০ শতাংশের বেশি।
কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরুষ ১০ লাখ ৪২ হাজার ৫৬২ জন এবং নারী ৪ লাখ ২১ হাজার ৭৮৮ জন। অর্থাৎ সরকারি চাকরিতে নারীর অংশ প্রায় ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ, বিপরীতে পুরুষের অংশ ৭১ শতাংশের বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কম অংশগ্রহণের পাশাপাশি সরকারি চাকরিতেও নারীর প্রতিনিধিত্ব কম। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের 'সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান–২০২৫' অনুযায়ী, দেশে সরকারি চাকরির মোট পদ ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন এবং শূন্য পদ প্রায় সোয়া ৫ লাখ।
উচ্চপর্যায়ের পদে নারীর অংশগ্রহণ আরও নগণ্য। গ্রেড–১–এ কর্মরত ১ হাজার ১০৩ কর্মকর্তার মধ্যে নারী মাত্র ১৬২ জন, যা প্রায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত মোট কর্মকর্তা ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ জনের মধ্যে নারী ৪৬ হাজার ৯২৫ জন, অর্থাৎ প্রায় ২২ দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে সরকারি চাকরির এই পরিসংখ্যান দিয়ে সব ধরনের কর্মসংস্থানে নারীর অবস্থান বিচার করা যাবে না। বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক নারী কর্মরত রয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা, নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি মেয়েরা কেন পিছিয়ে পড়ছেন, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মপরিবেশকে আরও নারীবান্ধব করতে হবে। পরিবার ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখার সুযোগ তৈরি করা গেলে নারীদের কর্মজীবনে অংশগ্রহণ ও তা অব্যাহত রাখার পথ আরও সহজ হবে।”