এক দশক আগের সেই স্মৃতি রোমন্থন করুন। রাত ১২টা ২০ মিনিটে সান্ডারল্যান্ডের ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা গিয়েছিল যে, ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তখনও আশার আলো নিভে যায়নি। কিন্তু ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে যখন বিবিসি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল যে ব্রেক্সিট জয়ী হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরো দেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। যারা রিমেইনারদের ব্যঙ্গ করে ‘রিমোনার’ বলে ডাকতেন, তারা আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। ব্রিটেনের রাজনীতি তখন এক সার্কাসে পরিণত হয়; একসময় ‘পশ্চিমা বিশ্বের স্থিতিশীল পার্লামেন্টের মা’ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য মাত্র ১০ বছরে সাতজন প্রধানমন্ত্রী বদল করল। আমাদের রাজনৈতিক জীবনের এই চরম ধাক্কায় লেবার ও কনজারভেটিভ—উভয় দলই মারাত্মকভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। এমন এক গভীর ক্ষত, যা পুনরায় উন্মুক্ত করার সাহস কোনো রাজনৈতিক দলই দেখায়নি।

অবশেষে ব্রেক্সিট–সম্পর্কিত দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে ইইউতে আবার যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে টোরি (কনজারভেটিভ) দলটি তাদের আনা ব্রেক্সিট বিপর্যয়ের জন্য অনুশোচনা না করা পর্যন্ত রাজনৈতিক রাজ্য থেকে নির্বাসিত থাকবে।

চলতি সপ্তাহে থিঙ্কট্যাংক ‘আইপিপিআর’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে কেন ইইউর পূর্ণ সদস্যপদ ব্রিটেনের জন্য অপরিহার্য—আমাদের সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে এটি প্রয়োজন। ব্রেক্সিট আমাদের বিশ্বরাজনীতির বড় জোটগুলোর সামনে একা এবং বন্ধুহীন করে ফেলেছে। আমাদের এককালের বিশ্বস্ত মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে এখন আর পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। কারণ, তাদের জনগণ কাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনতে পারে, তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। ফলে চ্যানেল পারের পরিচিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উষ্ণ অভ্যর্থনা এখন বেশ আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। ‘সার্বভৌমত্ব’ আসলে এক প্রকার মরীচিকা; কারণ প্রতিটি চুক্তি বা বাণিজ্যচুক্তির জন্য মিত্রদের সঙ্গে সার্বভৌমত্ব ভাগ করে নিতে হয়।

ব্রেক্সিটের এক বছরের মধ্যেই যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ মানুষের মনে হয়েছিল যে, ব্রেক্সিট একটি ভুল পদক্ষেপ ছিল। আর এখন আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, ব্রেক্সিটের কারণে আমাদের জিডিপির বিশাল ৮ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ মানুষ পুনরায় ইইউতে যোগ দিতে আগ্রহী, আর ২৯ শতাংশ মানুষ বাইরে থাকতে চায়। সময়ের সাথে সাথে এই সমর্থনের মাত্রা বাড়ছে। এর কারণ হলো, প্রবীণ প্রজন্মের জায়গায় এখন তরুণেরা ভোটাধিকার পাচ্ছে। বর্তমান বরিস জনসন/ লর্ড ফ্রস্টের চুক্তিটি এতটাই অকার্যকর যে তা বজায় রাখা একধরনের দায়িত্বহীনতা।

কিন্তু জনমতকে উপেক্ষা করে কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক ইইউ রাষ্ট্রদূতকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছেন যে তিনি ক্ষমতায় এলে সব পরিবর্তন বাতিল করবেন, যা ব্রাসেলসের মধ্যকার আলোচনাকে নস্যাৎ করার শামিল। অন্যদিকে ব্রেক্সিটের কারিগর মাইকেল গোভ এখনো দাবি করছেন, তিনি কোনো কিছুর জন্য অনুতপ্ত নন। তবে এসব কথায় জনগণ আর বিভ্রান্ত হবে না।

কিন্তু ৫২ শতাংশ বনাম ২৯ শতাংশের এই জনমত কি এতই সুদৃঢ় যে এখনই পাশা উল্টে দেওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাবে? না, এখনো নয়। জরিপের এই সমর্থন এখনো বেশ নরম বা ভঙ্গুর। ইউকিপ এবং টোরি ব্রেক্সিটপন্থীরা ইস্যুটিকে পুনরায় চাঙা করার আগপর্যন্ত ইইউ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেশ কমই ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে গণভোটের ঝুঁকি নিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত হেরেছিলেন। এবার আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।

প্রতিবেদনে দুই পক্ষের যুক্তিরই চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে পুনরায় যোগ দেওয়ার কিছু ঝুঁকি ও জনপ্রিয় দিক ফুটে উঠেছে। ইউরো মুদ্রা গ্রহণ করা, অন্যান্য বাণিজ্যচুক্তি বাতিল করা, মাছ ধরার অধিকার ছেড়ে দেওয়া বা ইইউ বাজেটে মোটা অঙ্কের অবদান রাখা—এসব বিষয় জনগণের মনে লালবাতি জ্বালিয়ে দেয়।

তবে ইইউতে ফেরার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হিসেবে উঠে এসেছে পাসপোর্টের দীর্ঘ সারি এড়ানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্রিটেনে হারিয়ে যাওয়া বৈদেশিক বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনা। কিন্তু শান্ত পরিবেশে আলোচনা আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের (টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স) মিথ্যা তথ্য ও প্রোপাগান্ডার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। আগের গণভোটের সেই মিথ্যা আশ্বাসগুলোর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে, ‘সপ্তাহে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হবে’, ‘তুর্কিরা আসছে’ বা ‘নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজে নাও’! গণভোট আসলে এমনই উন্মাদনা তৈরি করে।

তাই এখনই সময় নয়। ইইউতে যোগ দেওয়ার যুক্তিগুলোকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করতে হবে এবং ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করতে হবে। জ্বালানি, পানি, পরিবহন বা বিমান চলাচলের মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলোতে যখন মারাত্মক সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ছে, তখন ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

এক দশকে ব্রিটেন বদলে গেছে। ব্রেক্সিটপন্থীরা হয়তো অভিবাসনের ভয় দেখাবে, কিন্তু জরিপ বলছে ‘ফ্রিডম অব মুভমেন্ট’ নিয়ে মানুষ আগের মতো আর আতঙ্কিত নয়। এখন মানুষের প্রধান চিন্তা জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন নয়।

পলি টয়েনবি গার্ডিয়ান–এর কলামিস্ট

গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত