খাবারের ব্যবসায় নিয়মের বেড়াজালে আরও এক ধাপ যুক্ত হলো। এখন থেকে রাস্তার পাশে পিঠা-পুরি, ফলের রসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবারের অস্থায়ী দোকান চালালেও নিবন্ধন নিতে হবে ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এই নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে বিএফএসএ।

এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা আরও জটিল হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে এই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক নিবন্ধন, ভ্যাটের নিবন্ধনসহ বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স বা অনুমোদন সংগ্রহ করতে হয়। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)-এর নিবন্ধন।

রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক—নির্ধারিত শ্রেণির সব খাদ্য ব্যবসাকেই এই নিবন্ধন বা লাইসেন্সের আওতায় আনা হয়েছে। তবে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি হবে বিনামূল্যে। অন্যদিকে, বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের নিবন্ধনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ফি দিয়ে বিশেষায়িত লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হবে।

গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬’ জারি করা হয়েছে। এই নতুন বিধান অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে সংশ্লিষ্ট খাদ্য ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের মালিকরা নিবন্ধন ও লাইসেন্স গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “নিবন্ধনের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করা হলে খাবার বিক্রেতাদের শৃঙ্খলায় আনা যাবে। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে। জবাবদিহির জায়গা তৈরি হবে।” তবে এই প্রক্রিয়ায় কাউকে হয়রানি করা হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

চেয়ারম্যানের মতে, বর্তমানে অনেকেই রাস্তায় খাবার বিক্রি করছেন। কিন্তু এসব খাবারের কারণে জনস্বাস্থ্যে কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা প্রয়োজন। আর সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে বিএফএসএ-র এই পদক্ষেপকে নির্যাতনের নতুন ‘হাতিয়ার’ হিসেবে দেখছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, “এই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি লাইসেন্স নিতে হয়। শর্তের কারণে সেটাই নেওয়া যায় না। নতুন এই উদ্যোগ জরিমানা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।” এই খাতের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি একক নিয়ন্ত্রণকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন এই উদ্যোক্তা।

মোট ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসা ও খাদ্য স্থাপনার জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ, ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, প্যাকেটজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী, কাঁচা ও তাজা খাদ্য ছাড়া অন্যান্য খাদ্যপণ্যের আমদানিকারক, পিঠা–পুরি, পেঁয়াজুসহ খাবার বিক্রেতা, পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও হিমাগার, ভোজ্যতেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদনসহ খাদ্য ব্যবসা।

বিশেষ ধরনের খাবারের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর। শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি বিশেষ খাবারের ব্যবসা করতে নিবন্ধনের পাশাপাশি লাইসেন্স নিতে হবে। এছাড়া স্বাস্থ্যসহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য ও নিউট্রাসিউটিক্যালের মতো খাবারের নির্ধারিত ব্যবসার জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক।

পাশাপাশি জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত খাদ্য, জৈব খাদ্য, অভিনব খাদ্য ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার ব্যবসায়ীদেরও লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করতে হবে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রচলিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার জন্য প্রথমবার বিনামূল্যে নিবন্ধন দেওয়া হবে। তবে বিশেষায়িত খাদ্য ব্যবসার লাইসেন্সের জন্য ফি বা মাশুল দিতে হবে। প্রিমিসেস লাইসেন্সের ফি প্রতিষ্ঠানের আয়তনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। ১০০ বর্গমিটার বা তার কম আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য মাশুল ১০ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের প্রতিষ্ঠানের জন্য মাশুল হবে ৬০ হাজার টাকা।

এই নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর, যা মেয়াদ শেষে নবায়ন করতে হবে। এছাড়া খাদ্যপণ্যের প্যাকেটে বিএফএসএ-র নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। এর ফলে ভোক্তারা পণ্যের নিবন্ধন সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং কোনো অভিযোগ থাকলে ওই নম্বর ব্যবহার করতে পারবেন।

বিএফএসএ জানিয়েছে, নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬-এর তফসিল ১০ অনুযায়ী নির্ধারিত মাশুল পরিশোধ করে এবং প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করে আবেদন করতে হবে। নিবন্ধনের জন্য নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করে আবেদন জমা দিতে হবে।

প্রাথমিকভাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট জেলা কার্যালয়ে আবেদন করা যাবে। তবে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইনে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, যেসব খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক, সেগুলো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালনা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএফএসএ।