রাজধানীর পূর্বাচলে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাদকসহ ৮৫ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৬ জন নারী রয়েছেন, যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। এই বিপুল সংখ্যক নারী ওই বাড়িতে কী করছিলেন, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, ওই বাড়িতে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো এবং ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব পার্টিতে সাধারণ মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হতো।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে ডিবি সূত্রে জানা যায়, পূর্বাচলে অবস্থিত আব্দুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন ওই বাসাটি গত এক বছর ধরে মাদক সেবন, মাদক কারবার এবং রাতভর ডিজে পার্টির আখড়া হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিশেষ অভিযানে ওই বাসা থেকে মাদক সেবনকারী ও আয়োজকসহ মোট ৮৫ জনকে আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে আফগানিস্তানের এক নাগরিকও রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ডিবি সূত্র আরও জানায়, বাসাটি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হলেও সেখানে নিয়মিত মাদক সেবন, মাদক কেনা-বেচা এবং ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। বিশেষ করে রাতভর সেখানে মদ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনের আসর বসত। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীদের নিয়ে অশ্লীল নৃত্যসহ রাতভর আনন্দ-উল্লাসের আয়োজন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, টানা প্রায় এক বছর ধরে ওই বাসায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছিল। বাসাটি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়ার পর একজন হোস্ট ও একজন কো-হোস্টের মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এই ঘটনায় কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে আটক করেছে ডিবি।
অভিযানের সময় ওই বাসা থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ, কনডম এবং ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলে ডিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বাসাটি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। একজন কো-হোস্ট ও হোস্টের মাধ্যমে সেটি পরিচালিত হচ্ছিল। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে কয়েকজন তরুণী রয়েছেন। যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাদের ছবি প্রকাশ বা নাম ঠিকানা প্রকাশ করার আইনগত সুযোগ নেই।’
ডিবির একটি সূত্রের দাবি, আটক কো-হোস্টকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির তদবির করেছিলেন। তবে পুলিশ সদস্য ও ডিএমপির কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এই কারণে সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত থেকে শুরু হওয়া অভিযান শেষ করতে মঙ্গলবার সকাল হয়ে যায়। এমনকি যাচাই-বাছাই করে মামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় লেগেছে।
ডিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অতিরিক্ত ডিআইজির প্রভাব ও ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ওই বাসায় মাদক কারবারিদের একটি আখড়া গড়ে উঠেছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে মাদক সেবন ও রাতভর আনন্দ-উল্লাসের সুযোগ করে দিয়ে অর্থ আদায় করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।’
ওই কর্মকর্তার দাবি, এসব কর্মকাণ্ড থেকে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বণ্টন করা হতো এবং প্রায় ৭০ শতাংশ টাকা অতিরিক্ত ডিআইজির তহবিলে জমা পড়ত বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবি সূত্র আরও জানায়, বাসাটিতে প্রতি রাতেই মদসহ ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। এসব আয়োজনে বিভিন্ন বয়সী তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীরাও অংশ নিতেন। তাদের জন্য দেশ-বিদেশের উচ্চবিত্ত মধ্যবয়সী পুরুষদের আনাগোনা ছিল বলে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পেরেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসা কীভাবে মাদক সেবন ও ব্যবসার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এর অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী কারা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং জব্দ করা আলামতের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এই বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, তিনি সাংবাদিক পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দেন।
এদিকে, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে হেডকোয়ার্টার্স শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আব্দুল্লাহ আল জহিরকে হেডকোয়ার্টার্স শাখায় সংযুক্ত করা হলো। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।