বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব এখন বাংলাদেশেও স্পষ্ট। জ্বালানির চড়া দাম, পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি এবং ফুয়েলের গুণগত মান নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে গাড়ি চালকদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার দীর্ঘ যানজট এবং প্রচণ্ড গরমের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন ও ফুয়েল সিস্টেমের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। যানজটের সময় হাইব্রিড গাড়ির ইঞ্জিন বারবার বন্ধ এবং চালু হতে থাকে, যা সিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ব্যবহৃত সাধারণ পেট্রলচালিত গাড়ির ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেমে বিভিন্ন ধরনের ডিপোজিট বা তলানি জমে যেতে পারে, যা নানা যান্ত্রিক সমস্যার জন্ম দেয়। এসব জটিলতা থেকে গাড়িকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়ে বর্তমানে গাড়ি মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ঢাকার ব্যবসায়ী আরাফাত হোসেন একটি হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহার করেন। তিনি জানান, যানজটে চলাচলের সময় গাড়ি বারবার ব্রেক করতে হয় এবং গাড়ি থামলে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে ব্যাটারি মোডে চলে যায়। পুনরায় ব্যাটারি থেকে ইঞ্জিনে পরিবর্তনের সময় গাড়িতে কিছুটা ধাক্কা অনুভূত হয়। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে আমি হাইব্রিড অ্যাডিটিভস ব্যবহার শুরু করি। এর পর থেকে লক্ষ করছি, গাড়ি ব্রেক করার সময় ধাক্কার অনুভূতিটা অনেকাংশেই কমে গেছে। এ ছাড়া এখন অকটেন বুস্টারও ব্যবহার করছি। এখন ফুয়েল নেওয়ার পর অকটেন বুস্টার ব্যবহারের ফলে অন্য সময়ের তুলনায় মাইলেজ গড়ে দুই-তিন কিলোমিটার বেশি পাচ্ছি।’

ফুয়েল সিস্টেমের এই সমস্যা কেবল হাইব্রিড গাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের ব্যবহারের ফলে নন-হাইব্রিড গাড়ির ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেমেও বিভিন্ন ধরনের ডিপোজিট জমতে পারে। এর ফলে ফুয়েল সরবরাহের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে এবং সামগ্রিকভাবে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স হ্রাস পায়।

চাকরিজীবী ফারদিন জামান সোহান একজন নন-হাইব্রিড গাড়ি ব্যবহারকারী। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন সময়ে ফুয়েল নেওয়ার কারণে গাড়ির ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেমে ডিপোজিট জমেছিল। তাতে আমার ফুয়েল ইনজেকশনে ব্লকেজ তৈরি হয়। ফলে রাফ আইডেলিং থেকে শুরু করে এক্সিলারেশন ভারী হয়ে যাওয়া, আরপিএম ফ্লাকচুয়েট করার মতো সমস্যাগুলো হচ্ছিল।’

পরবর্তীতে ইনজেকশন ক্লিনার ব্যবহারের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ফারদিন জামান সোহান আরও বলেন, ‘পরে ইনজেকশন ক্লিনার ব্যবহার করার পর দেখলাম ডিপোজিটগুলো আর জমছে না এবং আমার ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেমটাও পরিষ্কার আছে। এ ছাড়া ইঞ্জিনে ভাইব্রেশন হওয়া, আরপিএম ফ্লাকচুয়েট করা এবং এক্সিলারেশন ভারী মনে হওয়ার মতো সমস্যাও আর হচ্ছে না।’

সাধারণত ফুয়েল অ্যাডিটিভসকে গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফুয়েল সিস্টেমে ডিপোজিট তৈরি হওয়া বা জমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট ধরনের অ্যাডিটিভ ব্যবহার করা হয়। তবে কোন গাড়িতে কোন ধরনের অ্যাডিটিভ প্রয়োজন হবে, তা সম্পূর্ণভাবে গাড়ির ধরন এবং বিদ্যমান সমস্যার ওপর নির্ভর করে।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত অটো মেক ওয়ার্কশপের সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার মো. আকাশ জানান, ফুয়েলের নিম্নমানের কারণে গাড়ির ফুয়েল সিস্টেমে নানা সমস্যা দেখা দেয়। নিয়মিত ফুয়েল সিস্টেম পরিষ্কার ও সার্ভিসিং না করলে এক পর্যায়ে ইনজেক্টর বা ফুয়েল পাম্পের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তিনি লক্ষ্য করেছেন, অনেকেই শুরুতে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেন না, যার ফলে পরবর্তীতে ইনজেক্টর পরিবর্তন বা ফুয়েল পাম্প মেরামতের প্রয়োজন হয় এবং এতে বাড়তি খরচ ও ভোগান্তি বাড়ে। তাই সময়মতো ফুয়েল সিস্টেমের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ফুয়েল অ্যাডিটিভসের মধ্যে ইনজেকশন ক্লিনার এবং অকটেন বুস্টারের কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। ইনজেকশন ক্লিনার মূলত ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেমে জমে থাকা ময়লা বা ডিপোজিট পরিষ্কার করতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, অকটেন বুস্টার ফুয়েলের অকটেন রেটিং বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। তাই অ্যাডিটিভ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেবল জ্বালানি খরচ কমানোর কথা চিন্তা না করে গাড়ির প্রকৃত প্রয়োজন বোঝা প্রয়োজন। গাড়ির প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের ব্যবহারবিধি মেনে চলা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মনে রাখা প্রয়োজন, ফুয়েল অ্যাডিটিভ মূলত প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণের একটি অংশ। যদি ফুয়েল সিস্টেমের কোনো যন্ত্রাংশ যান্ত্রিকভাবে নষ্ট হয়ে যায়, তবে কেবল অ্যাডিটিভ ব্যবহার করে সেটি ঠিক করা সম্ভব নয়।

সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার মো. আকাশ এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘ইনজেক্টর বা ফুয়েল সিস্টেমের কোনো অংশ যান্ত্রিকভাবে নষ্ট হয়ে গেলে সঠিকভাবে পরীক্ষা করে ওয়ার্কশপে প্রয়োজনীয় মেরামত করাতে হবে। অর্থাৎ গাড়িতে রাফ আইডেলিং, অস্বাভাবিক ভাইব্রেশন, আরপিএম ওঠানামা কিংবা এক্সিলারেশনে সমস্যা দেখা দিলে শুধু অ্যাডিটিভ ব্যবহার করেই সমাধান হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সমস্যার কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার্ভিসিং করানো জরুরি।’

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে গাড়ি ব্যবহারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় একটি গাড়ি কতটা কার্যকরভাবে ফুয়েল ব্যবহার করছে এবং ফুয়েল সিস্টেম কতটা সুস্থ অবস্থায় আছে—এই দুটি বিষয়ই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সার্ভিসিং, ফুয়েল সিস্টেমের প্রতি নজর রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক অ্যাডিটিভ ব্যবহার করা রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হতে পারে। তবে অ্যাডিটিভকে যান্ত্রিক সমস্যার বিকল্প হিসেবে না দেখে প্রতিরোধমূলক যত্নের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। পারফরম্যান্সে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে কারণ শনাক্ত করে সার্ভিসিং করানোই শ্রেয়। এতে গাড়ির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় থাকে এবং বড় ধরনের মেরামতের ঝুঁকি ও খরচ কমানো সম্ভব হয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।