ঢাকার ধামরাইয়ে অবস্থিত আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে কৃত্রিম অচলাবস্থা তৈরি করে প্রায় ২০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, পণ্যবাহী গাড়ির চালকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা ও বকশিশ আদায় বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়ায় শ্রমিকদের একটি অংশকে উসকানি দিয়ে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এই পুরো ঘটনায় স্থানীয় এক ইউপি সদস্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় দুই নেতার ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা খান অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে, সোমবার (১৯ অক্টোবর) এই ঘটনার প্রেক্ষিতে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারখানার পণ্য ওঠানো-নামানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম. এম. এন্টারপ্রাইজের কিছু শ্রমিকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে পণ্যবাহী ট্রাকের চালকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বকশিশ ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল। অভিযোগ রয়েছে যে, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চালকদের মারধর ও লাঞ্ছিত করা হতো। সম্প্রতি কারখানা কর্তৃপক্ষ এই ধরনের অনুমোদনহীন অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

কর্তৃপক্ষের এই নিষেধাজ্ঞার পর সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের একটি অংশ প্রথমে কাজ বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে তারা কাজে ফিরলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ লোকবল নিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজ শুরু করেন। এর ফলে কারখানার স্বাভাবিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে তাদের প্রায় ২০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ যখন নতুন ঠিকাদার বা ভেন্ডর নিয়োগের উদ্যোগ নেন, তখন স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাদের কাজ বন্ধ করার হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এরই জেরে সোমবার বিকেলে নতুন ভেন্ডরের শ্রমিকদের একটি অংশ কাজ বন্ধ করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে নেমে আসেন। এসময় তারা কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হয়।

এদিকে কারখানার কাজ সচল রাখার প্রচেষ্টায় নতুন ভেন্ডরের কয়েকজন শ্রমিক কাজ শুরু করলে সোমবার দুপুরে তাদের কয়েকজনকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নতুন ভেন্ডর কর্তৃপক্ষও ধামরাই থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। ওই অভিযোগ অনুযায়ী, আব্দুল কাদের নামের এক শ্রমিক সরদারকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করা হয়েছে।

কারখানা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পুরো ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন মেসার্স এম. এম. এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মোজাম্মেল হক এবং কুশুন্দিয়া এলাকার ইউপি সদস্য মো. ঈমান আলী। নতুন ভেন্ডরকে সরিয়ে দিয়ে পুনরায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য তারা কারখানা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগে জানানো হয়েছে।

এ ঘটনায় স্থানীয় যুবলীগ নেতা মো. মামুন এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় যুবদলের এক নেতার বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হস্তক্ষেপ করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা নতুন ভেন্ডরের কর্মীদের কারখানা থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন এবং নিজেদের লোক দিয়ে কাজ পরিচালনার জন্য কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।

কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান যে, নতুন ভেন্ডরকে বাদ দেওয়ার শর্তে তাদের শ্রমিকেরা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে রাজি আছেন।

সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, শ্রমিক বা চালকদের ওপর শারীরিক নিগ্রহের মতো ঘটনা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার পরিপন্থি। একটি সুনির্দিষ্ট চক্রের অযৌক্তিক কর্মবিরতি ও ধীরগতির কারণে কারখানার উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।”

তিনি আরও বলেন, “কারখানার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং কর্মরত ব্যক্তিদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে আইনানুগভাবে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।”

এ বিষয়ে ধামরাই থানার ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, “আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কর্তৃপক্ষের একটি লিখিত আবেদন পাওয়া গেছে। একটি স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”