বছরের শুরুতেই মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি। কন্যাসন্তানের নাম রেখেছিলেন স্নো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর শেষ পোস্টটিও ছিল মেয়েকে ঘিরেই। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার পুরো হৃদয়জুড়ে ছোট্ট স্নো।’ তবে সেই আবেগঘন পোস্টের মাত্র তিন মাস পর চলে গেলেন অস্ট্রেলীয় মডেল, ফ্যাশন ডিজাইনার ও ইনফ্লুয়েন্সার সাহারা রে। তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৪ বছর। ২০১৬ সালে কানাডীয় পপতারকা জাস্টিন বিবারের সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জনে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।

গত রোববার (১৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে সাহারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গতকাল সোমবার মার্কিন বিনোদনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টিএমজেড তাঁর মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ করে। সাহারার পরিবার সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছে, মৃত্যুর মুহূর্তে হাসপাতালে তাঁর পাশে স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘শেষ মুহূর্তে পরিবারের সবাই তাঁর পাশে ছিলেন। সবাই তাঁকে খুব ভালোবাসতেন।’

মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি পরিবার। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ফেন্টানিল নামক এক শক্তিশালী মাদকজাতীয় ব্যথানাশকের অতিরিক্ত মাত্রা গ্রহণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। জানা গেছে, গত শুক্রবার রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত রোববার জীবনরক্ষাকারী সেই ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় পরিবারকে। ডেইলি মেইলের বরাতে পেজ সিক্সও একই তথ্যের কথা জানিয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পরিবার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত মাত্রায় ওষুধ গ্রহণের ঘটনাটি দুর্ঘটনাবশত ঘটেছিল কি না, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সাহারা এবং মেয়ের নাম রাখেন স্নো। মা হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েকে নিয়ে তিনি একাধিক পোস্ট দিয়েছিলেন। সন্তান জন্মের আগে ২৫ জানুয়ারি তিনি অনুসারীদের জানিয়েছিলেন, সেদিন রাতেই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে। মা হওয়ার আনন্দের খবরের পাশাপাশি নিজের উদ্বেগের কথাগুলোও তিনি অনুসারীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন।

গত ১৯ জুলাই ইনস্টাগ্রামে মেয়ের কয়েকটি ছবি পোস্ট করে ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন সাহারা। সেটিই ছিল তাঁর ইনস্টাগ্রাম গ্রিডের শেষ পোস্ট। মৃত্যুর পর সেই ছবিগুলোর নিচে এখন আবেগঘন মন্তব্য করছেন তাঁর অনুসারীরা।

মৃত্যুর আগে বেশ কয়েক বছর ধরে শারীরিক নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন সাহারা। ২০২৪ সালে তিনি প্রকাশ করেছিলেন যে, গিয়াঁ-বারে সিনড্রোম নামক এক বিরল স্নায়বিক রোগে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। সাহারার ভাষ্যমতে, ওই বছরের এপ্রিলে একটি গাড়ি দুর্ঘটনার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মদ্যপ এক গাড়িচালক তাঁকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ঊরুর ওপরের অংশ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত অনুভূতি ও চলাচলের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। ফলে তখন তাঁকে হুইলচেয়ার ও হাঁটার সহায়ক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হতো। ২০২৪ সালের মে মাসে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম সেভেন নিউজ তাঁর অসুস্থতা ও পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে সাহারা জানিয়েছিলেন, মুহূর্তেই তাঁর জীবন বদলে গেছে, তবু সুস্থ হওয়ার আশা তিনি ছাড়েননি। পরবর্তীতে তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতিও হয়েছিল।

শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনের সংকট নিয়েও প্রকাশ্যে কথা বলেছিলেন সাহারা। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি জানান, মাদক ও অ্যালকোহলনির্ভরতা থেকে মুক্তি পেতে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই উদ্দেশ্যে ৩০ দিনের একটি পুনর্বাসন কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। মানসিক স্বাস্থ্য ও আসক্তির চিকিৎসা নেওয়ার অভিজ্ঞতা তিনি অনুসারীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন। তবে অতীতে আসক্তির চিকিৎসা নেওয়ার সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক মৃত্যুর কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

অস্ট্রেলিয়ার পরিচিত সার্ফার টনি রের মেয়ে সাহারা শৈশবের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া ও হাওয়াইয়ে। বাবার সূত্রে ছোটবেলা থেকেই সমুদ্র ও সার্ফিংয়ের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়। তবে কৈশোর পেরিয়ে তিনি মডেলিং ও ফ্যাশন ডিজাইনের প্রতি আগ্রহী হন। ২০১৪ সালে তিনি তাঁর নিজস্ব সাঁতারের পোশাকের ব্র্যান্ড ‘সাহারা রে সুইম’ চালু করেন। মডেলিংয়ের পাশাপাশি ব্যবসা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তার মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

২০১৬ সালে হাওয়াইয়ে জাস্টিন বিবারের সঙ্গে ছুটি কাটানোর ছবি প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরে আসেন সাহারা। তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। এর আগে অস্ট্রেলীয় সংগীতশিল্পী কোডি সিম্পসনের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কের গুঞ্জন উঠেছিল।

সাহারার মৃত্যুর পর তাঁর মা গ্রেচেন বাখ ডেইলি মেইলকে বলেছেন, মেয়ে ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ও সদয় একজন মানুষ। পরিবার, ফ্যাশন, ছোট্ট মেয়ে স্নো আর সার্ফিং—এসব নিয়েই ছিল তাঁর ভালোবাসার পৃথিবী।