বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা যাচাই করার ক্ষেত্রে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স (জিআইআই) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য পরিমাপক হিসেবে বিবেচিত হয়। ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) কর্তৃক প্রকাশিত এই সূচকটি মূলত কোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত ভিত্তি এবং সৃজনশীলতার বিকাশের প্রকৃত চিত্র বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতির দিকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই সূচকের তথ্যগুলো বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের জন্য মৌলিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।
ডব্লিউআইপিও ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬ প্রকাশ করেছে। এই সূচকটি প্রস্তুত করতে বিশ্বজুড়ে মোট ১৩৭টি দেশের উদ্ভাবন সক্ষমতা ও সাফল্যের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রকাশিত এই নতুন সূচকে ২১.৫ স্কোর অর্জন করে বাংলাদেশ ১০৫তম স্থানে অবস্থান করছে। তবে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২০তম। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ দশম স্থানে রয়েছে। উদ্ভাবনের বিভিন্ন সূচকে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং সৃজনশীলতার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৬তম। তবে এবারের সূচকে মোবাইল অ্যাপ তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছে। মোবাইল অ্যাপ সৃজনে ৬৭.৬ নম্বর পেয়ে বৈশ্বিকভাবে ৬৭তম স্থান দখল করে নিয়েছে দেশ।
দক্ষিণ এশিয়া ও সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে প্রযুক্তি এবং নতুন উদ্ভাবনের প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ভারত ৩৮তম স্থান দখল করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এই অঞ্চলে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়ে কাজাখস্তান ৭৩তম স্থানে উঠে এসে দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করেছে। ভুটান ৭৪তম স্থান লাভ করে এই অঞ্চলের তৃতীয় স্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে কিরগিজস্তান ও পাকিস্তান চারটি করে ধাপ এগিয়ে যথাক্রমে ৯২তম ও ৯৫তম স্থানে উঠে এসেছে। এছাড়া নেপাল ১০৪তম স্থানে উঠে এসেছে এবং বাংলাদেশ রয়েছে ১০৫তম স্থানে। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কথা বললে, ভিয়েতনাম ৪৩তম, থাইল্যান্ড ৪৪তম, মঙ্গোলিয়া ৭২তম এবং কম্বোডিয়া ৯৩তম স্থানে উঠে এসেছে। উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলেও উন্নতির চিত্র দেখা গেছে, যেখানে সৌদি আরব ৪২তম স্থান অর্জন করেছে। তিউনিসিয়া ৭১তম, মিসর ৮৩তম, আজারবাইজান ৮৫তম, লেবানন ৮৬তম এবং আলজেরিয়া ১১১তম অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের উদ্ভাবনী কাঠামোর বিভিন্ন খাতের তথ্য বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। অবকাঠামো বা ইনফোস্ট্রাকচার খাতে বাংলাদেশের মোট স্কোর ৪০.২ এবং বৈশ্বিক অবস্থান ৮৪তম। অবকাঠামো খাতের অধীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) উপসূচকে দেশের প্রাপ্ত নম্বর ৬৫.৫ এবং অবস্থান ৯৩তম। তথ্যপ্রযুক্তির সুনির্দিষ্ট সূচকগুলোর মধ্যে আইসিটি সুবিধা বা অ্যাকসেসে প্রাপ্ত নম্বর ৫৫.৪ (১১৭তম) এবং আইসিটি ব্যবহারে প্রাপ্ত নম্বর ৭২.৬ (৯১তম)। এ ছাড়া সরকারের অনলাইন সেবায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সরকারি অনলাইন সেবায় ৬৮.৪ নম্বর পেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৭তম স্থানে উন্নীত হয়েছে।
সৃজনশীল উদ্ভাবন বা ক্রিয়েটিভ আউটপুট খাতে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর ১৬.৮ এবং অবস্থান ৮৭তম। অদৃশ্য সম্পদ বা ইনট্যাঞ্জিবল অ্যাসেট উপসূচকে বাংলাদেশ ২০.২ নম্বর পেয়ে ৮১তম অবস্থান ধরে রেখেছে। এর মধ্যে সেরা ১৫টি ইনট্যাঞ্জিবল অ্যাসেট ইনটেনসিটিতে ৪০.৪ স্কোর নিয়ে অবস্থান ৬১তম। ট্রেডমার্ক সূচকে ৪.৮ স্কোর নিয়ে অবস্থান ১২৪তম এবং শিল্প নকশা বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনে ০.৬ নম্বর পেয়ে ৭৭তম স্থানে রয়েছে। ক্রিয়েটিভ গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট সূচক ২.৮। অনলাইন ক্রিয়েটিভিটি বা অনলাইন সক্ষমতায় বাংলাদেশ ২৩.৮ নম্বর পেয়ে ৯০তম স্থান পেয়েছে। অনলাইন সৃজনশীলতার বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা যায়। বিশেষ করে শীর্ষ স্তরের ডোমেইনে ০.২ পয়েন্ট নিয়ে অবস্থান ১২৩তম এবং গিটহাব কমিট সূচকে ৩.৬ নম্বর নিয়ে ৯৮তম অবস্থান রয়েছে।
সূত্র: ডব্লিউআইপিও গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৬