ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গুরুত্বারোপ করেন যে, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের নিরাপত্তা প্রদান করা সরকারের প্রধান দায়িত্ব।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি দেওয়া এক বিশেষ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তার সাথে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক।

দেশপ্রেম ও জাতীয় সংহতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার। আসুন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশটিকে গড়ি।’

রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ধর্ম আলাদা হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রটা আমাদের সবার। বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্রটি আমাদের সবার। এই দেশটিতে আপনার যেমন অধিকার আছে, আমারও অধিকার আছে। এই দেশের প্রতি আপনার যেমন কর্তব্য আছে, আমারও এই দেশের প্রতি কর্তব্য আছে।’

নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়া, ঠিক একইভাবে এই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আমাকেও নিরাপত্তা দেওয়া। আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে আমরা একে অপরকে দেখে রাখব। আমরা একে অপরের সঙ্গে কাজ করে এ দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’

জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এই দেশের সন্তান, এই দেশের মানুষ, আমরা বাংলাদেশি। আমরা প্রত্যেকে মানুষ। সবার আগে এটিই হচ্ছে আমাদের পরিচয়। এখানে উপস্থিত আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশি।’

বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনার জন্য, তখন কিন্তু আমরা কেউ দেখিনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিষ্টান; যুদ্ধের মাঠে কিন্তু এটা আমরা দেখিনি, কখনো জিজ্ঞেসও করিনি।’

গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সব ধর্মের মানুষের একাত্মতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় দেশে গণতন্ত্র যখনই হুমকির মুখে পড়েছে, মানুষ যখন তার রাজনৈতিক অধিকার, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজপথে নেমে এসেছে। তখনও কিন্তু আন্দোলনকারী একজন পাশের জনকে জিজ্ঞেস করেনি, ভাই আপনি কি মুসলমান, নাকি আপনি হিন্দু, নাকি আপনি বৌদ্ধ, নাকি আপনি খ্রিষ্টান? কেউ তো জিজ্ঞেস করেনি। সবাই সেদিন সোচ্চার ছিলাম মানুষের কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘বেশি দিন আগের কথা নয়। এই তো মাত্র আড়াই বছরও হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। চোখটা বন্ধ করলেই আমাদের চোখের সামনে সবগুলো দৃশ্য ভেসে ওঠে। সেই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। কেউ কি আমরা কাউকে জিজ্ঞেস করেছি, ভাই আপনি কোন ধর্মের মানুষ?’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সব ধর্মের মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেদিন তো সব ধর্মের মানুষই ছিল। অনেকেই শহীদ হয়েছেন, আজকেই আমি ওসমানী উদ্যানে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করে এসেছি। সেখানে তো হিন্দু মানুষও আছে, মুসলমান মানুষও আছে, বৌদ্ধও আছে, খ্রিষ্টানও আছে। সবাই তো সেদিন জান কোরবানি দিয়েছেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।’

দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশের পরিবর্তন ঘটলে, দেশের মানুষের পরিবর্তন ঘটলে আপনি যেমন উপকৃত হবেন, আমিও উপকৃত হব।’

মানবিকতার কথা বলে তিনি আরও বলেন, ‘যখন কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন যেমন দেখে না কোন ধর্মের মানুষ, যখন মানুষ ভালো থাকে, তখনো মানুষ দেখে না। শুধু দেখে আপনিও মানুষ, আমিও মানুষ।’

পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমরা আমাদেরকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমরা একে অপরকে আরেকজনকে চিনি ও জানি।’

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে এই অনুষ্ঠানটি হচ্ছে একটি আনন্দের অনুষ্ঠান। আজকে এই অনুষ্ঠানটি হচ্ছে একটি মিলনমেলা।’