গ্রামের খেতখামার, শহরের কারখানা, ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাত—এসব কিছুর সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ নারী। গত বেশ কয়েক বছরে কৃষি আর শিল্পে নারীর অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ ওলট–পালট করে দিয়েছে মূলধারার প্রচলিত ভাবনাকে। বাজার ও বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে গ্রামীণ নারীর লড়াই নিয়ে লিখেছেন মাহা মির্জা ও মারজিয়া প্রভা।

দেশের একটি শীর্ষ পত্রিকায় ১৩ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে: গ্রামের দরিদ্রদের আয় চলে যাচ্ছে ঋণের কিস্তি পরিশোধে। প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত ছবিতে দুজন পুরুষ কৃষককে দেখা যায়। কৃষির লোকসান সম্পর্কিত প্রতিবেদনে সাধারণত পুরুষ কৃষকের ছবিই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণের মূল গ্রহীতা পুরুষ নয়, নারী।

কিস্তির চাপ ও অত্যাচারও বহন করে নারী। গ্রামাঞ্চলে নারী কৃষক, নারী খামারি, নারী উদ্যোক্তা, এমনকি নারী খেতমজুরের সংখ্যা অবিশ্বাস্য হারে বেড়েছে। কিন্তু ধান, পাট, আলু, সবজি, গরু–মুরগির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লাখ লাখ উৎপাদক নারী প্রায় সময়ই মূলধারার কৃষি ও অর্থনীতির আলোচনায় ঢুকতে পারে না।

ভারতে কৃষকের আত্মহত্যা যখন মহামারির আকার ধারণ করে, কয়েকটি প্রদেশে গৃহবধূদের আত্মহত্যার সংখ্যাও তখন ক্রমান্বয়ে বাড়ছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, ওই সব এলাকার পারিবারিক কলহ বেড়েছে কি না। হঠাৎ কয়েক প্রদেশের গৃহবধূ শয়ে শয়ে আত্মহত্যা করছেন কেন—এই খবর নিতে গিয়ে দেখা গেল, আত্মহত্যা করা এসব ‘গৃহবধূ’র একটি বড় অংশই আসলে কৃষক। বাড়ির পুরুষ সদস্যটি শহরে কাজ খুঁজতে যাওয়ার পরে নারীরা পারিবারিক কৃষি ও খামারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দেখা গেল পরপর কয়েক মৌসুমে ফসলের দাম পাননি ওই নারীরা। কিন্তু জমির নিবন্ধন বাড়ির পুরুষ সদস্যটির নামে। ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারা নারীরা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু জমির নিবন্ধন নিজের নামে না থাকায় মৃত্যুর পরেও কৃষকের টাইটেল পাননি।

এভাবে দুই দশকে ভারতের হাজার হাজার কৃষক নারীর আত্মহত্যাকে ‘পারিবারিক কারণে’ গৃহবধূর আত্মহত্যা হিসাব দেখানোর সুযোগ পেয়েছে দেশটির সরকার। কৃষির চরম বাজারীকরণকে ‘নারীর আলোচনা নয়’ ভাবলে নারীর সামগ্রিকতাকে ধারণ করার দৃষ্টিভঙ্গিটাই পাল্টে যেতে পারে।

বাস্তবতা হলো, গ্রামের খেতখামার, শহরের কারখানা, ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাত—এই সবকিছুর সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ নারী। গত বেশ কয়েক বছরে কৃষি আর শিল্পে নারীর অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ ওলট–পালট করে দিয়েছে মূলধারার প্রচলিত ভাবনাকে। বিবিএসের লেবার ফোর্স (২০২৪) জরিপটি দেখুন। কৃষিতে যুক্ত নারীর সংখ্যা কত, আর পুরুষের সংখ্যা কত? দেশে কৃষিতে পুরুষ এক কোটি ৩০ লাখ, আর নারী এক কোটি ৭০ লাখ। অর্থাৎ অনেকগুলো বছর ধরেই কৃষিতে নারীই সংখ্যাগরিষ্ঠ!

নারী বহু ফ্রন্টে লড়াই করে। পরিবার, বাবা, স্বামী, স্কুল, বিয়ে, সমাজ, পোশাক—এই সব যুদ্ধ সামলিয়ে বাজারব্যবস্থা, এনজিও, ক্ষুদ্রঋণ, কোম্পানি, সিন্ডিকেট, বাণিজ্যচুক্তি, জলবায়ু, হেন কিছু নাই তার চলার পথে ক্রমাগত বাধা তৈরি করে না। পরিবারের কন্যাশিশুটির স্কুলে পড়া, কোচিংয়ে যাওয়া, মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়া চালানো, কলেজ শেষ করে ঢাকায় পড়তে চাওয়া বা গার্মেন্টসে চাকরি করার সিদ্ধান্ত, বিয়ে, বাচ্চা সব ধাপেই তার বিরামহীন সংগ্রাম।

নারীর লড়াই শুধু ‘ঘর বনাম বাহির’ কিংবা ‘রক্ষণশীলতা বনাম প্রগতি’র বাইনারি নয়। এ দেশের কৃষক নারীকে প্রতিনিয়ত এক অসম বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। বাজার মানে কোম্পানির দৌরাত্ম্য, বাজার মানে সিন্ডিকেট। বাজার মানে পাঁচ বছরে কৃষি উপকরণের ২৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি। বাজার মানে সার–সংকট, অসৎ ডিলারশিপ। দেখলে মনে হয় ধান–আলু–পটোলের জগৎটা শুধু পুরুষের, কিন্তু বাস্তবে কী?

আপাতদৃষ্টিতে ট্যারিফ, শুল্ক বা ‘ফ্রি ট্রেড’ ম্যাক্রো অর্থনীতির বিষয়; বিশ্বরাজনীতি, অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ বা ফুলবাড়ীর কয়লাখনি—গ্রামীণ নারীর উঠান থেকে অনেক দূরে। কিন্তু ‘পুরুষ’ বিশেষজ্ঞদের তৈরি করা মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির প্রথম ভুক্তভোগী কে হবে? পায়রা কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ভুক্তভোগী কে ছিল? ফুলবাড়ী কয়লাখনির প্রথম ভিকটিম কে হতে যাচ্ছে? আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে যত কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে, যত লাখে লাখে মানুষ উচ্ছেদ হয়েছে, তার সর্বকনিষ্ঠ ভুক্তভোগী কে?—এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি।

গত এক যুগে রামপাল, মাতারবাড়ী, বাঁশখালী, পায়রাসহ এ দেশের প্রতিটি মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলাকায় আমরা গিয়েছি এবং উচ্ছেদ হওয়া অসংখ্য নারী-কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছি। একটি প্রবণতা খুব স্পষ্ট। উচ্ছেদ হওয়া কমিউনিটির প্রথম ভুক্তভোগী পরিবারের কন্যাশিশুটি। জোর করে কয়েক হাজার হেক্টর কৃষিজমি অধিগ্রহণের পর প্রথমেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালুর স্রোতে চাপা পড়ে গিয়েছিল পায়রার প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। শত শত মেয়েশিক্ষার্থীর পক্ষে দূরের স্কুলে গিয়ে পড়া চালানো আর সম্ভব হয়নি।

জমি হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার করছে অগণিত গ্রামীণ পরিবার। ক্ষতিপূরণের টাকায় দু–এক বছর চলে। তারপর শুরু হয় বাল্যবিবাহের হিড়িক। সারা বাংলাদেশে বন্ধ হওয়া পাবলিক কলকারখানাগুলোতেও একই অবস্থা। কারখানা বন্ধের প্রধান ভিকটিম পরিবারের ১৪ বছরের মেয়েটি। প্রথমে স্কুল বন্ধ, কোচিং বন্ধ, তারপর ধুপধাপ বিয়ে।

ম্যাক্রো অর্থনীতি, মেগা প্রকল্প, বাণিজ্যচুক্তি, জ্বালানিসংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ‘ফুলবাড়ীর কয়লা তোলা যাবে কি যাবে না’—এগুলো কি শুধু বিশেষজ্ঞদের তর্কের বিষয়? ফুলবাড়ীর খনি নিয়ে কথা বলবে কেবল খনি বিশেষজ্ঞ? মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলাপ করবে শুধু ‘ট্রেড এক্সপার্ট’? গ্যাস, কয়লা, বিদেশি চুক্তি, অর্থনীতি—এসব দিয়ে ‘গ্রামের বেটিদের’ কী কাজ? এলিট পুরুষ বিশেষজ্ঞরা বদ্ধ ঘরে আলাপ করবেন, সিদ্ধান্ত নেবেন। আর উচ্ছেদের তালিকায় থাকা লাখে লাখে গ্রামগঞ্জের নারী আজীবনের ভিটেমাটি, কৃষিজমি, পুকুর, জলাশয়, কমিউনিটির অধিকার ছেড়ে দিয়ে ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’–এর ‘কোলাটেরাল ড্যামেজ’ হবেন?

মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বলছে, আমেরিকার ডেইরি ও পোলট্রি পণ্য বাংলাদেশের বাজারে ‘শূন্য শুল্কে’ আমদানি করতে হবে। ডিম, দুধ, হিমায়িত গরুর মাংস, মুরগির মাংস, গরুর নাড়িভুঁড়ি, মাখন, দই, পনির, কী নেই সেই তালিকায়! মার্কিন সরকার যুগে যুগে সার, বীজ, পেস্টিসাইড, কৃষি যন্ত্র, মজুত–সংরক্ষণ, ইনস্যুরেন্স—এই প্রতি ধাপেই প্রচুর ভর্তুকি দেয়। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভর্তুকি পাওয়া মাছ, মাংস বাংলাদেশের বাজারে এলে, তার প্রভাব বুঝতে কি আমাদের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ডেকে আনতে হবে, গ্রামীণ নারী বুঝবে না এই সামান্য অঙ্ক?

গত এক যুগে দেশে গরু–ছাগলের সংখ্যা বেড়েছে এক কোটি! হাঁস–মুরগির সংখ্যা আরও বেশি। কে বাড়াল এই সংখ্যা? গ্রামীণ খামারগুলো টিকে আছে কাদের শ্রমে ও যত্নে? গবাদিপশুর সঙ্গে সন্তানের মতো বন্ধন কার? গরুর খড়, ভুসি, ঘাসের জন্য সারাটা দিন দুশ্চিন্তা করা মানুষটি কে? প্রায় ৭০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করা এই ইন্ডাস্ট্রির ‘ব্যাকবোন’ কারা?

লিবারেল অর্থনীতিবিদেরা সারা জীবন বলে এসেছেন, মুক্তবাজারে নাকি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা হয়। অথচ কার সঙ্গে কার প্রতিযোগিতা? হাজার কোটি টাকার ড্যানিশ কোম্পানির সঙ্গে ‘জোড়া গাইয়ের মালিক রহিমা’র প্রতিযোগিতা হয়? নব্বইয়ের দশকে গুঁড়া দুধের অবাধ আমদানিতে গ্রামীণ নারীর হাতে গড়ে ওঠা খামারগুলোর কী পরিণতি হয়েছিল? ক্ষুদ্র খামারগুলো থেকে মিল্ক ভিটার দুধ সংগ্রহ পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছিল কেন? সমবায়ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল কেন? ‘ফ্রি ট্রেড’, শুল্ক হ্রাস অথবা বাণিজ্যচুক্তি কি তাহলে নারীর ইস্যু নয়? বহুজাতিক কোম্পানির স্থানীয় বাজার দখলের প্রথম ভুক্তভোগী কি গ্রামের উৎপাদক-নারী নয়? মিলিয়ন ডলার ভর্তুকি পাওয়া আমেরিকার মাছ, মাংস, ডিমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা সম্ভব সিরাজগঞ্জের খামারি নারীটির?

শহরে হকার উচ্ছেদ হচ্ছে, অটোরিকশা ভাঙা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, গ্রামে ফেরত যাও। ঢাকার এই হকার অটোরিকশার ইস্যুটিও আমাদের সামনে হাজির হয়েছে একটি পুরুষালি সমস্যা হিসাবে। গ্রামে খেতমজুর পাওয়া যায় না, কৃষি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, গ্রামের সমস্ত ‘বেটা লোক’ শহরে এসে অটো চালায়, শহর নষ্ট করে ফেলে—এই হলো অভিযোগ। অটোচালক, হকার, পুলিশ, সিটি করপোরেশনের মেয়র (অনির্বাচিত), ‘কচর–মচর’ করে ফুটপাতের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া বুলডোজার চালক, সবাই পুরুষ। তো এই ভাঙাভাঙির মহাযজ্ঞে গ্রামীণ নারীর কাজ কী? মাইগ্রেশন, অটো, হকার, ফেলে আসা কৃষি, সবই কি স্রেফ পুরুষের ইস্যু?

বাস্তবতা হলো, গ্রামের খেতখামার, শহরের কারখানা, ঢাকার রাস্তা ও ফুটপাত—এই সবকিছুর সঙ্গেই গভীরভাবে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ নারী। গত বেশ কয়েক বছরে কৃষি আর শিল্পে নারীর অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ ওলট–পালট করে দিয়েছে মূলধারার প্রচলিত ভাবনাকে। বিবিএসের লেবার ফোর্স (২০২৪) জরিপটি দেখুন। কৃষিতে যুক্ত নারীর সংখ্যা কত, আর পুরুষের সংখ্যা কত? দেশে কৃষিতে পুরুষ এক কোটি ৩০ লাখ, আর নারী এক কোটি ৭০ লাখ। অর্থাৎ অনেকগুলো বছর ধরেই কৃষিতে নারীই সংখ্যাগরিষ্ঠ!

বাজারি কাঠামোকে আলাদা সমস্যা হিসেবে আড়ালে রেখে, বরং নারীকে ‘হিজাব বনাম নন-হিজাব’, ‘চরিত্রবান বনাম চরিত্রহীন’, ‘সিগারেট খাওয়া বনাম না–খাওয়া’র বাইনারিতে ফেলে রক্ষণশীল বনাম প্রগতিশীলতার বিরামহীন ‘কালচারাল যুদ্ধ’ চলছে। চলমান নারীবিদ্বেষের সময়কালে এসব আলোচনার তাৎপর্য আছে। কিন্তু যে বৈশ্বিক করপোরেট কাঠামো ও বাণিজ্য নারীর শ্রম ও কর্মজীবনকে বিপন্ন করে তোলে, সেই রাজনীতিকে এ রকম বাইনারি আলাপে সীমাবদ্ধ করলে নারীর সংগ্রামের সামগ্রিকতাকেই সংকুচিত করা হয়।

এর মানে কি এই যে ঢাকায় রিকশা চালাতে আসা ‘মৌসুমি বেকার’ পুরুষটি কৃষি থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত? একেবারেই তা নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, মৌসুমি অটোচালকদের একটা বিশাল অংশ কৃষি পরিবার থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি। বরং ঢাকায় এসে পরিবারের আয়কে বহুমুখীকরণ করেছেন মাত্র। ঢাকায় যে পুরুষ হকারি করছেন বা অটো চালাচ্ছেন, তাঁর পরিবারের নারীরাই গ্রামে চাষ করছেন, ধান কাটছেন। কৃষির লোকসান কমাতে, জলবায়ুর ধকল সামলাতে, অথবা ঋণের চক্র থেকে বের হতে কৃষি পরিবারগুলোর অন্তত একজন সদস্য শহরে এসে বাড়তি আয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

বলা যায়, ঢাকার ইনফরমাল অর্থনীতি এখন গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলোর টিকে থাকার একমাত্র কৌশল। তাই পারিবারিক সিদ্ধান্তে পুরুষ মাইগ্রেশন করলে নারী কৃষিকাজের হাল ধরছেন, খামার করছেন। এ কারণেই দেশে মিশ্র পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে, নারীপ্রধান পরিবারের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। আবার লাখে লাখে মাইগ্রেন্ট শ্রমিক শহরের উপার্জন থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন কৃষক নারীকে। নারী বিনিয়োগ করছেন বর্গায়, হাঁস–মুরগির খামারে, এনজিওর ঋণ পরিশোধে।

গ্রাম ও শহর, নারী ও পুরুষ, কৃষি ও অটোর পারস্পরিক অর্থনৈতিক যোগসূত্র না বুঝেই শহুরে মধ্যবিত্ত ‘মডার্ন সিটি’র মাতমে মেতেছে। ‘গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করো’ বলে সবক দিচ্ছে, অথচ কৃষি কীভাবে চলে, কে বা কারা চালায়, সেখানে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, নারী ও পুরুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, গ্রামের নারী ও ঢাকার পুরুষ দুজন মিলেই কীভাবে গ্রামের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে—এই বোঝাপড়ার দায় নেই কারও।

বহু বছর হলো স্থানীয় বীজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে নারী। বাজারের ৮০ শতাংশ বীজ দেশি–বিদেশি কোম্পানির দখলে। সরকারি বীজ সরবরাহ অপ্রতুল, কখনো অতিরিক্ত দাম, কখনো কোম্পানির খারাপ বীজ কিনে খারাপ ফলন, কখনো বাড়তি ফলনে দাম পড়ে যাওয়া। এদিকে বড় কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেটের কারণে হাঁস–মুরগির ফিডের দাম বেড়েই চলেছে। পাঁচ বছরে বাচ্চা মুরগির দাম বেড়েছে ২৫ টাকা! এমন সিন্ডিকেটের বাজারে সপ্তাহে সপ্তাহে কিস্তি শোধ করা যায়? এর মধ্যে হুট করে অসুস্থতা, হাসপাতালের দৈন্যদশা, মেয়ের বিয়ে, যৌতুকের চাপ—এসব সামলাতেও নারীকেই ঋণ নিতে হচ্ছে। এক এনজিওর ঋণ শোধ করতে করতেই আরেক এনজিও থেকে টাকা ওঠাতে হচ্ছে। এই ঋণের চক্র তাঁকে নিঃস্ব করে, ঘরছাড়া করে এবং ঢাকার ‘ছুটা বুয়া’য় পরিণত করে।

গত এক যুগে হাজার কোটি টাকার জলবায়ু তহবিল ঢুকেছে বাংলাদেশে (১৪ বছরে ২৬৮ মিলিয়ন ডলার)। কিন্তু এই অর্থ কি হাওর, বাঁওড়, চর ও উপকূলের নারীদের পানির সংকট বা অর্থনৈতিক বিপন্নতা কমাতে পেরেছে? শত শত প্রকল্প, সেমিনার, ওয়ার্কশপ, গবেষণাপত্র, গোলটেবিল চলছেই। ‘জলবায়ুর পরিবর্তনে নারী’, ‘লবণাক্ততায় নারী’, ‘ফসিল ফুয়েল (মূলত কয়লা) ও নারী’, ‘অ্যাডাপ্টেশন’, ‘মিটিগেশন’, ‘রেজিলিয়েন্স’, ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’—কত বিচিত্র সব নামে টাকা ঢুকেছে এ দেশে। তৈরি হয়েছে পাঁচতারা হোটেলকেন্দ্রিক এক জমজমাট ‘ক্লাইমেট ইন্ডাস্ট্রি’। কোটি টাকার ফান্ড এসেছে, শুধু নারীকে আলাদা করে বোঝার জন্য। বাস্তবে, এনজিওর ঋণ, মেগা প্রকল্পের উচ্ছেদ, কৃষির লোকসান, গ্রাম ছেড়ে শহর যাওয়ার বিপন্নতা—এসব কাঠামোগত সমস্যার এতটুকু সমাধান হয়েছে?

বাজারি কাঠামোকে আলাদা সমস্যা হিসেবে আড়ালে রেখে, বরং নারীকে ‘হিজাব বনাম নন-হিজাব’, ‘চরিত্রবান বনাম চরিত্রহীন’, ‘সিগারেট খাওয়া বনাম না–খাওয়া’র বাইনারিতে ফেলে রক্ষণশীল বনাম প্রগতিশীলতার বিরামহীন ‘কালচারাল যুদ্ধ’ চলছে। চলমান নারীবিদ্বেষের সময়কালে এসব আলোচনার তাৎপর্য আছে। কিন্তু যে বৈশ্বিক করপোরেট কাঠামো ও বাণিজ্য নারীর শ্রম ও কর্মজীবনকে বিপন্ন করে তোলে, সেই রাজনীতিকে এ রকম বাইনারি আলাপে সীমাবদ্ধ করলে নারীর সংগ্রামের সামগ্রিকতাকেই সংকুচিত করা হয়।

মাহা মির্জা গবেষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মারজিয়া প্রভা নারী অধিকারকর্মী

মতামত লেখকদের নিজস্ব