কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশির বুকে ভেসে চলা ভাসমান রিসোর্ট বা ‘হাউসবোট’গুলো বর্তমানে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। হ্রদের শান্ত জল আর চারপাশের সবুজ পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং রাত্রিযাপনের জন্য রাঙামাটিতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই হাউসবোটগুলো। পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ ভ্রমণে আসছেন অসংখ্য পর্যটক। তবে এই জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে আছে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি, যা পর্যটকদের জীবনকে সংকটে ফেলতে পারে।
বর্তমানে রাঙামাটিতে অর্ধশতাধিক হোটেল ও দুই শতাধিক রিসোর্টের পাশাপাশি অন্তত ১০টি বিলাসবহুল হাউসবোট পরিচালিত হচ্ছে। এসব বোটে থাকার পাশাপাশি রান্নাবান্নার সুব্যবস্থা থাকায় পর্যটকদের কাছে এগুলো প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, রান্নার কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হলেও অধিকাংশ বোটে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নেই। যে অল্পসংখ্যক বোটে সরঞ্জাম রয়েছে, সেগুলোর মেয়াদও উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এছাড়া অনেক বোটে প্রয়োজনীয় লাইফ জ্যাকেটগুলো সহজে চোখে পড়ে না এমন জায়গায় রাখা হয়। ফলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড কিংবা নৌ-দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা সরঞ্জাম বৃদ্ধি এবং নিয়মিত তদারকির দাবি জানিয়েছেন পর্যটকরা।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আসা মো. মাহিম উদ্দিন রানা বলেন, “আমি বোটে উঠেই তাদের রান্নাঘরে যাই। সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোটেই পর্যাপ্ত মনে হয়নি। কিছু লাইফ জ্যাকেট দেখলেও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম চোখে পড়েনি।”
একই বোটে ভ্রমণরত দম্পতি রোজি আক্তার ও নাছের খান বলেন, “প্রতিটি কক্ষের সামনে ও বসার স্থানগুলোতে দৃশ্যমানভাবে লাইফ জ্যাকেট এবং অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখা উচিত, যেন বিপদের সময় খুঁজতে না হয়।” তারা এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বিশেষ গুরুত্ব প্রদান এবং নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি নিরাপত্তা সরঞ্জাম বাড়ানোর দাবি জানান।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক হাউসবোটের চালক ও কর্মচারীদের জরুরি মুহূর্তের নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যদিও হাউসবোট কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও সচল অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রেখেই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি কক্সবাজারের ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনার পর কাপ্তাই হ্রদের হাউসবোট, হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
রাঙামাটি ট্যুরিস্ট পুলিশের ওসি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, “হ্রদে ভ্রমণকারী পর্যটকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। যেসব বোটে নিরাপত্তা সামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোর মালিকদের তা অবিলম্বে পূর্ণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মাধ্যমে হাউসবোটের কর্মীদের আপৎকালীন মহড়া ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলে তারা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।”
রাঙামাটি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিউটন দাস বলেন, “আমরা হোটেল, মোটেল ও হাউসবোট মালিকদের কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে আলোচনা করেছি। তারা আগ্রহ দেখালেই আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করব। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন থেকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সাত দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই নির্ধারিত সময় পার হলে আমরা সমন্বিত মনিটরিং শুরু করব।”
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আফশারী জানান, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও হাউসবোট মালিকদের আগামী ৭ দিনের মধ্যে ন্যূনতম অগ্নিনির্বাপণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময় শেষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।