ইংরেজিতে ‘এসিআই’ লেখা একটি ছাঁচ। চ্যালেঞ্জ ছিল সিমেন্ট, বালু এবং পানির মিশ্রণ ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে সেই ছাঁচটি পূর্ণ করা। মাত্র ১২ সেকেন্ডের অবিশ্বাস্য দ্রুততায় এই কাজটি সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত দল ‘চুয়েট সি’।

তবে কেবল দ্রুত ছাঁচ পূর্ণ করলেই কাজ শেষ হতো না। মিশ্রণটিকে একটি পরিমাপক সিলিন্ডারে ২০ মিনিট রেখে পরীক্ষা করা হয়, যাতে দেখা যায় পানি, বালু ও সিমেন্ট-জাতীয় উপাদানগুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে কি না। দ্বিতীয় এই পরীক্ষাতেও অসাধারণ সাফল্য দেখান শিক্ষার্থীরা। সব মিলিয়ে ৮৬ দশমিক ৫০ নম্বর অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ‘মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি কম্পিটিশন ২০২৬ ’-এর ‘ওভারঅল এফিশিয়েন্সিতে’ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ‘চুয়েট সি’। গত ১১ অক্টোবর এই সুখবরটি আসে।

আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ব্রাজিলসহ মোট ১১টি দেশের ৪০টি দল অংশ নিয়েছিল। সামগ্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি ইকোনমিক্যাল ডিজাইন বিভাগে দ্বিতীয় এবং ইকোলজিক্যাল ডিজাইন বিভাগে চতুর্থ পুরস্কারও জয় করেছে ‘চুয়েট সি’।

এই সাফল্যের যাত্রা শুরু হয়েছিল যখন শিক্ষার্থীদের তৃতীয় বর্ষের ক্লাস শুরু হয়। এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার-চুয়েটের অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক জি এম সাদিকুল ইসলাম দীর্ঘ সময় ধরে সংগঠনের সদস্যদের উৎসাহিত করে বলছিলেন, ‘যদি একবার আমাদের কোনো দল যুক্তরাষ্ট্রে সশরীর প্রতিযোগিতায় যেতে পারত, তাহলে অবশ্যই ভালো রেজাল্ট আনা যেত।’

অধ্যাপকের এই কথাগুলো গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের চার শিক্ষার্থীকে। একদিন আড্ডার ফাঁকেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন একবার চেষ্টা করে দেখার। এরপর শুরু হয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া।

এরই মাঝে তাঁরা জানতে পারেন, মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চুয়েটের একটি দল চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। এই খবরটি চার বন্ধুর আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কিছুদিন পর তাঁরা জানতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রে পুরকৌশলবিষয়ক আরও একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং চুয়েটের আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) স্টুডেন্ট চ্যাপ্টারের মাধ্যমে সেখানে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

সুযোগ পাওয়ার পর তাঁরা আর দেরি করেননি। প্রতিযোগিতার নিয়মকানুন বোঝা, বিভিন্ন অনুপাতে উপকরণ মেশানো এবং পরীক্ষাগারে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা—এভাবেই পুরোদমে শুরু হয় তাঁদের প্রস্তুতি। একের পর এক অনুশীলন ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের তৈরি করেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টি দলের মধ্যে জায়গা করে নেয় চুয়েটের এই দল এবং খুলে যায় মূল প্রতিযোগিতার দরজা।

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া এই চার বন্ধু হলেন খন্দকার ফাহাদ আলম, সুমাইয়া বিনতে মান্নান, তানজিম মুশাররাত ও স্বরূপ চন্দ্র মোদক। তাঁদের সাথে একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের সানিউল হক, রূপম পোদ্দার ও আমীর হামজা মাহমুদ এবং তৃতীয় বর্ষের মো. সাইজউদ্দিন ফরহাদ দেশ থেকে সহযোগিতা করেছেন। পুরো দলটির মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও চুয়েট এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টারের অনুষদ উপদেষ্টা জি এম সাদিকুল ইসলাম।

আটলান্টায় এই বিশ্বজয়ের পেছনে ছিল কয়েক মাসের কঠোর ও নিরলস প্রস্তুতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের পরীক্ষাগারে বিভিন্ন অনুপাতে উপকরণ মিশিয়ে অসংখ্য পরীক্ষা চালিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় মিশ্রণ আশানুরূপ দ্রুত প্রবাহিত হয়নি, আবার কখনো দেখা দিয়েছে স্থিতিশীলতার সমস্যা। প্রতিবারই পরীক্ষার ফলাফল পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে উপকরণের অনুপাত পরিবর্তন করতে হয়েছে তাঁদের।

দলের সদস্যরা জানান, এই প্রস্তুতির জন্য তাঁরা ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করেছেন। অনেক দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক সময় শেষ হওয়ার পরও তাঁরা রাত জেগে পরীক্ষাগারে কাজ করেছেন। একেকবার পরীক্ষা চালিয়ে ফলাফল দেখেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য নতুন অনুপাত নির্ধারণ করেছেন।

দলের মেন্টর অধ্যাপক জি এম সাদিকুল ইসলাম এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘আমি খুবই গর্বিত। এটা শুধু চুয়েট নয়, আমাদের দেশের জন্যও একটা বড় অর্জন। এর আগে আমরা এসিআইয়ের অনলাইন ইকো কংক্রিট প্রতিযোগিতায় প্রথম ও কংক্রিট সলিউশন প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছিলাম। তা ছাড়া কংক্রিট প্রজেক্ট কম্পিটিশনেও আমরা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়সহ চারটি পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা আরও অনেক বেশি গর্বের।’

যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার খরচ ছিল অনেক বেশি। এই আর্থিক সংকটে এগিয়ে আসেন চুয়েটের প্রবাসী অ্যালামনাইরা। দলের সদস্য স্বরূপ চন্দ্র মোদক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে থাকা-খাওয়াসহ বিভিন্ন খরচ আমাদের অ্যালামনাই ভাইয়েরাই দিয়েছেন। এখানে এসে এত সহজে মানিয়ে নিতে পেরেছি যে মনে হচ্ছে আমরা ঘুরতে এসেছি। এ জন্য তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।’

প্রতিযোগিতার বিভিন্ন বিভাগে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত দলের সদস্যরা। দুটি ক্যাটাগরিতে তাঁরা মোট ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার পুরস্কার জিতেছেন।

একই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের আরও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাফল্য পেয়েছে—ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি)। আইইউটির শিক্ষার্থীদের দলটি ইকোলজিক্যাল ডিজাইন বিভাগে দ্বিতীয় হওয়ার পাশাপাশি ‘অ্যাস্থেটিকস ইন কংক্রিটে’ জাজেস চয়েস বিভাগেও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। কংক্রিট দিয়ে তৈরি নকশা বা শিল্পকর্মের সৌন্দর্য ও উপস্থাপনার ভিত্তিতে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সামগ্রিক ফলাফলে আইইউটির অবস্থান চতুর্থ। ফলে এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বের সেরা চার দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়।