বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, রাজপথের আন্দোলন ও মেয়র হওয়ার লড়াই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল। প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েই প্রতিমন্ত্রী হওয়া ছিল বড় অর্জন। কিন্তু অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাঁকে বিতর্কে ফেলে। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ইশরাক হোসেনকে।

বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার বয়স আট মাস হয়েছে। মন্ত্রিসভায় ইশরাক হোসেনের মেয়াদও আট মাস।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাকের উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে ডেকে পদত্যাগ করতে বলেন। তিনি আজ সকালে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন যে দুপুরে পদত্যাগ করবেন।

ঘটনাটি শুধু একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কে জড়িয়ে পড়াতেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা ও মন্ত্রীদের আচরণ কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে—সে বিষয়ে সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখতে হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। এর পর থেকেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। শক্তি প্রয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে রাজনীতিকেরা কতটা বের হতে পারলেন—এটাও মানুষ দেখতে চেয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১৮ বছর পর বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান।

এর মধ্যে গত মাসে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলায় দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

ইশরাকের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী ‘অ্যাকশনধর্মী’ অভিযানের পর কঠোর কোনো সিদ্ধান্ত আসছে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। এই বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী তাঁর কঠোর মনোভাব বজায় রেখেছেন, যা অন্যদের জন্য একটি কড়া বার্তা হিসেবেই দেখা উচিত।

ইশরাক হোসেনের বয়স ৩৯ বছর। তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। তিনি ছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র। পুরান ঢাকায় তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল শক্তিশালী।

২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর বাবার মৃত্যুর পর তাঁর (খোকা) তৈরি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সামনে আসেন তাঁর ছেলে ইশরাক হোসেন।

পেশায় ব্যবসায়ী, পড়াশোনা প্রকৌশল বিদ্যালয় স্নাতকোত্তর। উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন বিদেশে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্যও ছিলেন। পুরান ঢাকায় দলীয় কর্মসূচি, সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে তরুণ কর্মীদের কাছে পরিচিত করে তোলে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাও অর্জন করেন তিনি।

ইশরাক হোসেন গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করে জয়ী হন। এরপর তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

যেভাবে শক্তি প্রদর্শনের শুরু

২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস জয়ী হন। ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ইশরাক আইনি লড়াই শুরু করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মেয়র ঘোষণা করেন।

পরে নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু তাঁকে শপথ পড়ানো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

শপথ গ্রহণে ব্যবস্থা করার দাবিতে ইশরাকের সমর্থকেরা ২০২৫ সালের মে মাসে নগর ভবন ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে নগর ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়।

ইশরাকও আন্দোলনে যোগ দেন। সরকারের উদ্দেশে কঠোর বক্তব্য দেন। এমনকি শপথের ব্যবস্থা না করলে নিজেই শপথ নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসার হুঁশিয়ারিও দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, আদালতের রায় কার্যকর করতে হবে এবং ঢাকাবাসীর ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

রাজনৈতিকভাবে এই আন্দোলনের দুটি দিক ছিল। একদিকে তাঁর সমর্থকেরা এটিকে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে নাগরিক সেবা বন্ধ করে জনভোগান্তির কারণে তাঁর সমালোচনাই হয়েছে বেশি। এমনকি দলের ভেতরও তাঁর পরিপক্বতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত ইশরাক মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি। ঘটনাটিকে অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবেই দেখেন।

ইশরাক হোসেন মাদকবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে নিজেকে জাহির করতে চেয়েছিলেন বলেই মনে হয়। কিন্তু অস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতি কতটা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে তা হয়তো তিনি আমলেই নেননি। এই কর্মকাণ্ড যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বিতর্ক তৈরি করতে পারে, তা–ও বিবেচনায় নেননি।

মন্ত্রিসভার সদস্য কিংবা একজন রাজনীতিকের আচরণ ও ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা কত দূর পর্যন্ত যাওয়া উচিত সেই পরিমিতিবোধের অভাব লক্ষ করা গেছে ইশরাকের আচরণে।

বিতর্কের মধ্যেই ছিলেন ইশরাক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে সে সময় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা হাফিজ উদ্দিন আহমদ ছিলেন প্রধান অতিথি।

অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তা নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

এমন পরিস্থিতিতে ইশরাক হোসেন ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল না দিয়ে উত্তেজক বক্তব্য দিয়ে বসেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য এসেছেন? ডকুমেন্টারি দেখানোর জন্য এসেছেন? কী করছেন আপনারা? শহীদদের জন্য কী করেছেন? শহীদদের জন্য আপনারা কিছুই করেননি।’ তাঁর এ বক্তব্যের পর উত্তেজনা আরও বাড়ে।

একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ব্যক্তিদের শান্ত হতে বলেন এবং যাঁদের বক্তব্য আছে, তাঁদের মঞ্চে এসে তা তুলে ধরার আহ্বান জানান। এনসিপি নেতা আখতার হোসেনও বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

এর আগে গত জুলাইয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন। সেখানে যান প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও। রীতি অনুযায়ী, তিন বাহিনীর প্রধানেরা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্যালুট দেন। তবে দেখা যায়, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে ইশরাক হোসেনও স্যালুট দিচ্ছেন। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে অনেকে উপহাস করেন।

পরে এই বিষয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ইশরাক হোসেন লেখেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা উঠলে শ্রদ্ধায় আমার হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্যালুটে উঠে যায়। আমার হাত দিয়ে আমি বীর শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট দিয়েছি। হাত আমার, সম্মান জানিয়েছি সর্বজনশ্রদ্ধেয় বীরদের। দেশ আমার গণতান্ত্রিক; আমার ইচ্ছায় আমি স্যালুট দিয়েছি। যতবার ইচ্ছা হবে, যখন ইচ্ছা হবে, আমি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট জানাব।’

ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা, হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। তাঁর পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা।

প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক বার্তা

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগ করতে বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের অন্যদের জন্যও বার্তা দিয়েছেন। বার্তাটি হলো, মন্ত্রীদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার কাউকে দায়মুক্তি দেবে না।

তবে পদত্যাগের নির্দেশই চূড়ান্ত জবাব নয়। গেন্ডারিয়ার ঘটনায় আইন ভাঙা হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারিত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা, স্থানীয় অভিযোগ এবং উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর বিষয়েও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। মাদক নির্মূলও জরুরি।

ইশরাক শুধু প্রতিমন্ত্রী হন, সংসদ সদস্যও। ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেমে যাচ্ছে না। কিন্তু অল্প সময়ে পাওয়া ক্ষমতা ধরে রাখতে না পারার যে উদাহরণ, তা নিজের এবং ক্ষমতাসীন অন্যদের মধ্যে কতটা বোধ তৈরি করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ এই বিষয়ে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ইশরাকের কর্মকাণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন, অপরিপক্বতা, হামবড়া ভাবের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। তাঁর পরিণতিবোধের অভাবের কারণে সরকারের বদনাম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা অন্যদের জন্য একটা কড়া বার্তা।