এক সময়ের দুর্গন্ধময় বর্জ্যের পাহাড় আর মারাত্মক পরিবেশদূষণের কেন্দ্রবিন্দু এখন সবুজের সমারোহে ঘেরা এক দৃষ্টিনন্দন স্থান। দুই দশকের সেই পরিচিত রূপ বদলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ‘রূপান্তর’ নামক এক চমৎকার বাগান।
দীর্ঘদিনের বর্জ্যস্তূপকে সবুজে রূপান্তরের এই অনন্য উদ্যোগকে দেশের অন্যান্য জেলার প্রশাসকদের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই অভাবনীয় সাফল্যের জন্য তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় আমিনবাজারে নিমগাছ রোপণের মাধ্যমে ‘রূপান্তর’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে একটি এলাকাকে মানুষের কল্যাণে কীভাবে সুন্দরভাবে পরিবর্তন করা যায়, আমিনবাজারের এই উদ্যোগ তার বড় প্রমাণ। আপনারা যারা এলাকাবাসী, তারা জানেন দুই মাস আগে এই জায়গাটার কী অবস্থা ছিল। আর আজকে প্রায় দুই মাস পরে এই জায়গাটির কী পরিবর্তন হয়েছে! এই চার কিলোমিটার এলাকার মানুষের কাছে জায়গাটি দেখতে ভালো লাগার পাশাপাশি ভালো পরিবেশে শ্বাস নেওয়াও এখন সহজ হয়েছে।”
বক্তব্যের এক পর্যায়ে পরিবেশ রক্ষা এবং বাগানের এই সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সরকার উদ্যোগ নিয়ে এলাকাটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছে। এখন এই সৌন্দর্য ধরে রাখার দায়িত্ব এলাকাবাসীকেও নিতে হবে। জনগণ সরকারকে সহযোগিতা করলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা সম্ভব হবে এবং মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে।”
আমিনবাজারের এই সবুজায়নের উদ্যোগকে চার কিলোমিটারের গণ্ডির বাইরে আরও বিস্তৃত করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মহাসড়কের দুই পাশে অবস্থিত বিভিন্ন মিল ও কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পাশের ফাঁকা জায়গাগুলোর পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী, যাতে বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে পুরো অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ সবুজ ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা যায়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অন্য ৬৩ জেলার জেলা প্রশাসকদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অন্য জেলার প্রশাসকরাও এই ধরনের পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত হবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই দশক ধরে আমিনবাজার এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলার ফলে ৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচু স্তূপ তৈরি হয়েছিল। গত জুলাই মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সেনাবাহিনীর বর্ষাকালীন মহড়া পরিদর্শনে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বর্জ্যের ভাগাড় ও তীব্র দুর্গন্ধ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের তত্ত্বাবধানে সাভার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার সহযোগিতায় তিন মাসের নিরলস প্রচেষ্টায় জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করা হয়।
বর্জ্য অপসারণের পর জমি প্রস্তুত করা হয় এবং মাটির সুরক্ষায় প্যালাসাইডিং, পানি নিষ্কাশনের জন্য ২০টি সারফেস ড্রেন ও সার্ভিস শেড নির্মাণ করা হয়। মাটির ক্ষয়রোধের জন্য নেপিয়ার, দুর্বা ও বিন্নাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস লাগানো হয়েছে। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ থেকে ২৫ মিটার চওড়া এই বাগানে ১ হাজার ৫০টি নিমগাছ, ৩ হাজার ৮১৫টি সুপারি গাছ, ৬০টি তালগাছ, ৬৫০টি মাধবীলতা, ৪৫টি সিজিয়াম এবং ৭০০টি রঞ্জনসহ মোট ৬ হাজার ৫৮৫টি গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অংশ হিসেবে এখানে ২ কিলোওয়াট সোলার প্যানেল ও ১ কিলোওয়াট উইন্ড টারবাইনের মাধ্যমে মোট ৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া রাতের আলোকসজ্জার জন্য ১২০টি বৈদ্যুতিক বাতি স্থাপন করা হয়েছে। এই সামগ্রিক প্রচেষ্টার ফলে রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ আমিনবাজার এলাকা এখন দূষণমুক্ত এবং অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে।