রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলে হাতের ডানে দুর্গামন্দির। সেখানে আছে দেবী দুর্গার বড় প্রতিমা। ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রতিবছর এখানে দুর্গাপূজা হয়, এবারও হচ্ছে। এটি হচ্ছে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনের দুর্গাপূজা।

এর বাইরে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আরেকটি দুর্গাপূজা হয়। সেখানে যেতে হলে মেলাঙ্গন থেকে ‘শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির’ লেখা আরেকটি ফটক পেরোতে হয়। এরপর খালি পায়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মূল প্রাঙ্গণে ঢুকলে এক ফুট উঁচু দুর্গা প্রতিমার দেখা মেলে।

মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রায় আট শ বছর আগে এই এক ফুট উচ্চতার প্রতিমাটি ঘিরে ঢাকেশ্বরী মন্দির গড়ে উঠেছিল। ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এখানে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে।

অন্যান্য প্রতিমার বিসর্জন হলেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের এই এক ফুট উচ্চতার দুর্গা প্রতিমাটি রেখে দেওয়া হয়। বছরজুড়ে প্রতিদিন নিয়ম মেনে সেটার আরাধনা করা হয়। দুর্গোৎসবের সময় অন্যান্য মন্দির–মণ্ডপে যেমন লগ্ন ধরে দুর্গাপূজা হয়, এক ফুট উঁচু প্রতিমাটির সেভাবেই পূজা করা হয়।

গত সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে এক ফুট উচ্চতার দুর্গা প্রতিমাটি দেখা গেল। নানা রঙের ফুলে সজ্জিত প্রতিমাটির পাশেই একজন পুরোহিত বসে ছিলেন। কথায় কথায় জানালেন, এটি আদি প্রতিমা নয়। আদিটির আদলে পরবর্তী সময়ে বানানো হয়েছে। আদি প্রতিমাটি এখন আর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নেই।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রায় আট শ বছর আগে বল্লাল সেনের শাসনামলে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এখন এখানে দুটি দুর্গাপূজা হয়। আদি পূজাটির বয়স প্রায় আট শ বছর। আর ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে ১৯৭৮ সাল থেকে পূজা হয়ে আসছে।

শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস আরও বলেন, দুর্গোৎসবের সময় কেউ চাইলে ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে অঞ্জলি নিতে পারেন। আবার কেউ চাইলে মন্দিরের আদি পূজাতেও নিতে পারেন।

মন্দিরের প্রতিষ্ঠা নিয়ে মতভেদ

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। বাসুদেব ধরের লেখা ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির: অতীত ও বর্তমান’ বই এবং অমরেশ রায়ের লেখা ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’ বইয়ে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার পেছনে একটি প্রচলিত মতের কথা উল্লেখ রয়েছে।

লেখকেরা বলছেন, রাজা বিজয় সেনের স্ত্রী নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে ব্রহ্মপুত্র নদে পবিত্র স্নান শেষে ফেরার পথে ‘ঢাক’ বৃক্ষরাজির মধ্যে লুক্কায়িত অবস্থায় দুর্গা প্রতিমা দেখতে পান। তখন তিনি দেবী দুর্গার কাছে পুত্রসন্তান চান। একসময় তিনি পুত্রসন্তানের মা হন। সেই সন্তান হলেন—বল্লাল সেন।

পরবর্তী সময়ে বল্লাল সেন নিজের জন্মস্থানের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাঁর শাসনামলে (১১৫৮-১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) একটি মন্দির নির্মাণ করেন। সেখানে দুর্গা প্রতিমাটি স্থাপন করেন। আবিষ্কারের স্থান ‘ঢাক’ বৃক্ষে পরিপূর্ণ থাকায় প্রতিমাটি ‘ঢাকেশ্বরী’ নামে পরিচিত হয়। সেই অনুযায়ী, মন্দিরের নাম রাখা হয় ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’।

মুনতাসীর মামুনের লেখা ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়েও প্রায় একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়।

অমরেশ রায় তাঁর বইয়ে আরও একটি মতের কথা লিখেছেন। সেটি হলো—রাজা বল্লাল সেন স্বপ্নে আদেশ পেয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জঙ্গলাকীর্ণ স্থান থেকে ঢাকা বা আবৃত অবস্থায় দশভুজা বা দুর্গা প্রতিমাটি উদ্ধার করেন। পরে তিনি সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করে তাতে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর প্রতিমাটি ঢাকা বা আবৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বলে এর নাম রাখা হয় ‘ঢাকেশ্বরী’। মন্দিরটি পরিচিতি লাভ করে ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’ নামে।

ঢাকেশ্বরী আট শ বছরের পুরোনো একটি মন্দির। তখন থেকেই এখানে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে।

বাসুদেব ধর তাঁর বইয়ে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক আহমদ হাসান দানীর একটি বইয়ের (বাসুদেব ধর তাঁর লেখায় বইটির নাম উল্লেখ করেননি। বইটি হতে পারে ‘ডাক্কা: আ রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুন) কিছু অংশ তুলে ধরেছেন। সেটা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, দেবী ঢাকেশ্বরীকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ঢাকার ‘অধিষ্ঠাত্রী দেবী’ হিসেবে গণ্য করেন। এ দেবীর নামানুসারে ‘ঢাকা’ নামের উৎপত্তি।

আরেকটি জনশ্রুতি

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরেকটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। সেটা হলো—রাজা মানসিংহ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। আরও স্পষ্ট করে বললে, পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। এর স্থাপত্যশৈলী ১৭ শতকের শৈলীর প্রতি ইঙ্গিত করে। বর্তমান মন্দিরগুলোয় পুনর্নির্মাণের সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে।

বাসুদেব ধর তাঁর বইয়ে ১৯০৪ সালে সাইয়িদ আওলাদ হাসানের লেখা ‘নোটস অন দ্য অ্যানটিকস অব ঢাকা’ বই থেকে কিছু অংশ তুলে ধরেছেন। বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির এ অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত হিন্দু মন্দির। এটিকে বেশ প্রাচীন বলেই মনে করা হয়। তবে এর কোনো নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় না।’

জানতে চাইলে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঢাকেশ্বরী আট শ বছরের পুরোনো একটি মন্দির। তখন থেকেই এখানে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে।

আদি প্রতিমা এখন কলকাতায়

১২ অক্টোবর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে এক ফুট উচ্চতার দুর্গা প্রতিমাটি দেখা গেল। নানা রঙের ফুলে সজ্জিত প্রতিমাটির পাশেই একজন পুরোহিত বসে ছিলেন। কথায় কথায় জানালেন, এটি আদি প্রতিমা নয়। আদিটির আদলে পরবর্তী সময়ে বানানো হয়েছে। আদি প্রতিমাটি এখন আর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নেই।

মন্দিরের সামনের অংশের ডানপাশে ঢাকেশ্বরী দেবীর আদি ও বর্তমান প্রতিমার দুটি ছবি সাঁটানো রয়েছে। ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে, আদিটির সঙ্গে এখনকার প্রতিমায় দুর্গাসহ কিছু দেব–দেবীর মুখের আদলে পার্থক্য রয়েছে।

আদি প্রতিমাটি কোথায়—বাসুদেব ধর তাঁর ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির: অতীত ও বর্তমান’ বইয়ে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় ঢাকেশ্বরী প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। কিন্তু পুজো বন্ধ হয়নি। নতুনভাবে সজ্জিত হয়েছে ঢাকেশ্বরী মন্দির, বিগ্রহ পুনঃস্থাপিত হয়েছে।’

আদি প্রতিমাটি যে এক ফুট উঁচু ছিল, সেটাও এ বইয়ে উল্লেখ করেছেন বাসুদেব ধর।

অমরেশ রায়ের ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির’ বইয়েও বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, প্রায় আট শ বছরের পুরোনো দেবী ঢাকেশ্বরীর আদি প্রতিমাটি কলকাতার কুমারটুলির দুর্গাচরণ স্ট্রিটের শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দিরে রয়েছে। তবে তিনি বইয়ে লিখেছেন, আদি প্রতিমাটি দেড় ফুট উঁচু। তিনি আরও লিখেছেন, দেশভাগের সময় ঢাকা থেকে কলকাতায় প্রতিমাটি নেওয়া হয়। দেশভাগ–পরবর্তী দাঙ্গার সময় সম্ভাব্য আক্রমণ এবং লুণ্ঠনের হাত থেকে দেবীকে রক্ষা করতে ঢাকার আদি প্রতিমাটি গোপনে ও দ্রুততার সঙ্গে কলকাতায় নিয়েছিলেন রাজেন্দ্রকিশোর তিওয়ারি (মতান্তরে প্রহ্লাদকিশোর তিওয়ারি) এবং হরিহর চক্রবর্তী। সেটা ১৯৪৮ সালের ঘটনা।

উড়োজাহাজে কলকাতা যাত্রা

এ বিষয়ে বই দুটি থেকে জানা যায়, বিশেষ একটি উড়োজাহাজে করে ঢাকেশ্বরীর আদি প্রতিমাটি কলকাতায় নেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রথম দুই বছর হরচন্দ্র মল্লিক স্ট্রিটের দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাড়িতে বিগ্রহটির পূজা করা হয়। পরে ১৯৫০ সালে ব্যবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী কুমারটুলি অঞ্চলে দেবীর মন্দির নির্মাণ করে দেন। সেখানে প্রতিমাটি প্রতিষ্ঠা করে দেবীর নিত্যসেবার জন্য কিছু দেবোত্তর সম্পত্তি দান করেন তিনি।

আদি প্রতিমাটিতে দেবীর দশ হাত, কাত্যায়নী মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা রূপেই তিনি অবস্থান করছেন। পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী এবং নিচে কার্তিক ও গণেশ। বাহন রূপে পশুরাজ সিংহ দণ্ডায়মান, যার ওপর দাঁড়িয়ে দেবী মহিষাসুর বধ করেছেন। বর্তমানে ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে থাকা দুর্গা প্রতিমাটি দেবী ঢাকেশ্বরীর আদি প্রতিমার প্রতিরূপ।