চারিদিকে সবুজের সমারোহ, নানা জাতের ফুল ও ফলের গাছ। পেছনের দিকে বড় এক পুকুরে রুই-কাতলার চাষাবাদ চলছে। পুকুরের চারপাশের নির্দিষ্ট জায়গায় হাঁস, মুরগি ও টার্কির আলাদা আলাদা থাকার ব্যবস্থা। একপাশে চলছে পাখি পালন, আর অন্যপাশে সুন্দর অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা হয়েছে নানা প্রজাতির ছোট ছোট মাছ। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে এটি কোনো খামারবাড়ি, কিন্তু আদতে এটি একটি ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র।
বগুড়ার এই সবুজ ক্যাম্পাসে ১১৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পাশাপাশি পরিচালিত হচ্ছে। এই কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে কনফিডেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কনফিডেন্স পাওয়ার। একই সক্ষমতার আরেকটি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের রংপুরে রয়েছে। গত ৯ অক্টোবর বগুড়া এবং ১০ অক্টোবর রংপুরের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে এমন পরিবেশ চোখে পড়ে। রংপুরের বিদ্যুৎকেন্দ্রটিও একইভাবে সবুজে সাজানো।
গত ৯ বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ব্যবসা করছে কনফিডেন্স পাওয়ার। যদিও এই গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে সিমেন্ট খাতের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করে। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জির মোট সম্পদের পরিমাণ ৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পুরো কনফিডেন্স গ্রুপের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। গ্রুপের মোট ২০টি কোম্পানিতে বর্তমানে সাড়ে ৪ হাজার কর্মী কর্মরত আছেন।
তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় সফলতার পর এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কনফিডেন্স পাওয়ার। এই লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে তারা ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এই বিশাল বিনিয়োগের একটি অংশ হিসেবে পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বগুড়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় এই পরিকল্পনার কথা জানান কনফিডেন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ইমরান করিম। তিনি বলেন, “দেশে গ্যাসের সংকট সহসা মিটবে না। তাই আরও অনেক দিন বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে তরল জ্বালানিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর ভরসা করতে হবে। তবে বিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনতে কনফিডেন্স পাওয়ারও পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দরপত্রে অংশ নিয়ে তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে কনফিডেন্স পাওয়ার। এর মধ্যে কক্সবাজার ও বাগেরহাটে ১০০ মেগাওয়াট করে মোট ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বাগেরহাটের মোংলায় অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে যৌথ অংশীদার হিসেবে যুক্ত আছে বিদ্যুৎ খাতের পুরনো প্রতিষ্ঠান ডরিন পাওয়ার। এছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরও একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে কনফিডেন্স।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের এই অর্থায়নের জন্য বুক-বিল্ডিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলতে যাচ্ছে কনফিডেন্স। বিনিয়োগকারীদের সামনে শেয়ার বিক্রির প্রস্তাবনা তুলে ধরতে আজ ১৮ অক্টোবর একটি রোড শো আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পুঁজিবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের ৮৩ শতাংশ দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ক্রয় এবং ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। বাকি ১৫ শতাংশ ঋণ পরিশোধে এবং ২ শতাংশ আইপিও সংশ্লিষ্ট কাজে খরচ করা হবে।
বর্তমানে কনফিডেন্স পাওয়ারের মোট ৩৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৯ মেগাওয়াট উত্তরবঙ্গে এবং চট্টগ্রামে ৫৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে তাদের।
সরেজমিন পরিদর্শনকালে আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ও বিদ্যুতের চাহিদা-সরবরাহ নিয়ে একটি নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ইমরান করিম। সেখানে উল্লেখ করা হয়, প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। গত কয়েক বছর ধরে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও গ্যাসের অভাবে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকে। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আরও প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি সক্ষমতার কেন্দ্র নিয়মিত বন্ধ থাকে। সব মিলিয়ে এ খাতে ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা ব্যবহারের উপযোগী থাকে, যা জ্বালানির অভাবে সব সময় চালানো সম্ভব হয় না।
ইমরান করিম বলেন, “বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে সরকারের মহাপরিকল্পনা আছে। গ্যাস সরবরাহ শিগগিরই বাড়বে না। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেই ভরসা করতে হবে আমাদের। সরকারও সেদিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার। এর আগে মাত্র দুই বছরের মাথায় তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এনেছে। সাত বছর ধরে নিয়মিত সরবরাহ করছে।” সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও তারা সফল হবে বলে আশাবাদী তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন দরপত্রেও অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কনফিডেন্স পাওয়ার। বর্তমানের ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতাকে ২০২৯ সালের মধ্যে ১ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। পরবর্তীতে এই সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দুই হাজার মেগাওয়াটে নেওয়ার কথা ভাবছে কোম্পানিটি। উল্লেখ্য, ব্যাটারি শিল্পেও বিনিয়োগ রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের। তাদের দাবি, দেশের বর্তমান জ্বালানিসংকটের সমাধানে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।