বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কাদের সম্পদের হিসাব দিতে হবে, কোন কোন সম্পদ প্রদর্শন করতে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সম্পদ ও দায়ের বিবরণী প্রদান বাধ্যতামূলক—এই বিষয়গুলো মূলত করদাতার বার্ষিক আয়, মোট সম্পদের পরিমাণ এবং প্রচলিত কর আইনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
সাধারণত বেতন বা ব্যবসায়িক আয়ের হিসাব দিলেই সব ক্ষেত্রে করদাতার দায় শেষ হয় না। নির্দিষ্ট কিছু করদাতাকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ, দায় এবং বছরের শুরু ও শেষে সম্পদের প্রকৃত অবস্থা রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট, বাড়ি এবং মোটরযানের হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক। রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় করদাতাকে তার সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ জানাতে হয়। মূলত আয়ের সাথে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করার জন্যই কর কর্মকর্তারা এই বিবরণী তলব করেন।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, সকল করদাতার জন্য সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণত যাদের সম্পদের পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সীমার উপরে, তাদের জন্যই এই নিয়ম প্রযোজ্য।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তিন ধরনের করদাতাকে সম্পদের বিবরণী জমা দিতে বাধ্যতামূলক করেছে। করদাতার পরিসম্পদ, দায় ও ব্যয়ের তথ্যের জন্য আয়কর রিটার্নের আইটি ১০বি (২০২৩) ফরমটি ব্যবহার করা হয়।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী
যদি কোনো করদাতা সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকেন, তবে তাকে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমার সময় অবশ্যই সম্পদের বিবরণী দাখিল করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তার গ্রেড অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াটি বাধ্যতামূলক। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হ্রাস বা বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা।
৫০ লাখ টাকার বেশি সম্পদ থাকলে
কোনো করদাতার দেশে এবং বিদেশে অবস্থিত মোট সম্পদের মূল্য যদি ৫০ লাখ টাকার বেশি হয়, তবে তার জন্য সম্পদ বিবরণী প্রদান বাধ্যতামূলক। এই হিসাবের মধ্যে বাড়ি, প্লট, অ্যাপার্টমেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাবর সম্পদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সম্পদটি যে দামে কেনা হয়েছে বা যখন মালিকানা লাভ করা হয়েছে, সেই সময়ের বাজারদর অনুযায়ী এর হিসাব করতে হবে।
সম্পদমূল্য ৫০ লাখ টাকার কম হলেও
এমনকি করদাতার মোট সম্পদের মূল্য ৫০ লাখ টাকার কম হলেও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে সম্পদ বিবরণী দিতে হবে। যদি করদাতা আয়বর্ষের যেকোনো সময়ে মোটরযানের মালিক থাকেন, অথবা সিটি করপোরেশন এলাকার অভ্যন্তরে গৃহসম্পত্তি বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ করেন, কিংবা বিদেশে কোনো সম্পদের মালিক হন অথবা কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত থাকেন, তবে তাকে অবশ্যই সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হবে।
১০বি ফরমে যা জানাতে হয়
সম্পদের বিস্তারিত বিবরণ জানাতে হয় আয়কর ১০বি ফরমে। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এই নির্দিষ্ট ফরমটি পূরণ করতে হয়।
এই ফরমে যেসব সম্পদের মূল্য ও তথ্য প্রদান করতে হয় তার মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশে অবস্থিত ব্যবসায়িক সম্পদ, দায় ও মূলধন, শেয়ার ও অংশীদারি বিনিয়োগ, কৃষি ও অকৃষি জমি ও ঘর, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার-বন্ড, প্রদত্ত ঋণ, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মোটরযান, অলংকার, আসবাবপত্র এবং নগদ অর্থসহ অন্যান্য সম্পদ।
এছাড়া করদাতার যদি বিদেশে কোনো সম্পদ থাকে, তবে তার বিবরণও এখানে উল্লেখ করতে হবে। সব সম্পদের আর্থিক মূল্য যোগ করে মোট সম্পদের পরিমাণ লিখে করদাতাকে নাম, স্বাক্ষর ও তারিখসহ ঘোষণা প্রদান করতে হয়।
উল্লেখ্য যে, আইনের ধারা ১৬৭(২) অনুযায়ী বাংলাদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি ব্যক্তি করদাতাদের দেশি-বিদেশি সম্পদ ও দায়ের বিবরণী দাখিলের বিধান রয়েছে। তাই কেবল ৫০ লাখ টাকার সীমা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সঠিক হবে না; আইনের অন্যান্য শর্তাবলিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।