শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে এক অনন্য ও বিরল দৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে সেখানে লাল রঙের প্রতিমা স্থাপন করে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। এই ব্যতিক্রমী লাল রঙের প্রতিমা দর্শনে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য ভক্ত ও উৎসুক দর্শনার্থী।

আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচগাঁওয়ের এই পূজার বিশেষত্ব কেবল প্রতিমার লাল রঙের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। সাধক সর্বানন্দ দাসের হাত ধরে এই পূজার সূচনা হয়েছিল, যা সময়ের পরিক্রমায় বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় দুর্গোৎসবে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, সাধক সর্বানন্দ দাস আসামের কামাখ্যায় সাধনারত থাকাকালীন একটি শিশুকন্যা লাভ করেন। সময়ের সাথে সাথে শিশুটির শরীর লালবর্ণ ধারণ করতে শুরু করলে সাধক উপলব্ধি করেন যে, তার মধ্যে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। কথিত আছে, সাধকের প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে আবির্ভাবের বর প্রদান করেন এবং জানান যে, সেখানে তার প্রতিমার রং হবে লাল। এই গভীর বিশ্বাস এবং জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই গত ৩০০ বছর ধরে এখানে লালবর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

পাঁচগাঁওয়ের এই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত বিশেষ সব আয়োজন করা হয়। ঢাকের বাদ্যি, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস এবং পূজার নানাবিধ আনুষ্ঠানিকতায় পুরো মণ্ডপ এলাকা এক ভিন্ন আমেজ তৈরি করে। লালবর্ণের এই প্রতিমা দেখতে সব বয়সের মানুষ ভিড় করছেন। কেউ এসেছেন নিজের মনস্কামনা পূরণের আশায়, কেউ পরিবারের মঙ্গল কামনায়, আবার কেউ ছুটে এসেছেন কেবল ঐতিহ্যের টানে।

পাঁচগাঁও দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির পরিচালক সঞ্জয় দাস জানান, তাদের পরিবারে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লাল রঙের প্রতিমায় দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। এটি মূলত একটি পারিবারিক পূজা। তবে দেবীর জাগ্রত উপস্থিতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের প্রবল বিশ্বাসের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার পূজার আনুষ্ঠানিকতায় ছেদ পড়ে। সে বছর প্রতিমা পূজার পরিবর্তে ঘটপূজা করা হয়েছিল।” তিনি আরও জানান, পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি এবং স্থানীয় প্রশাসন সব ধরনের সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে।

পাঁচগাঁওয়ের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের পাশাপাশি মৌলভীবাজার জেলার অন্যান্য পূজামণ্ডপেও শারদীয় দুর্গোৎসবের নানা আয়োজন চলছে। জেলা শহরের বেশ কিছু মণ্ডপের প্রবেশপথ অত্যন্ত নান্দনিক নকশায় সাজানো হয়েছে। আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জায় চারদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এবার সার্বজনীন ৮৯৮টি এবং ব্যক্তিগত ১২৪টি মিলিয়ে মোট এক হাজার ২২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১১১টি, বড়লেখায় ১৪৬টি, জুড়ীতে ৭৬টি, কুলাউড়ায় ২২৭টি, রাজনগরে ১৩৬টি, কমলগঞ্জে ১৫৪টি এবং শ্রীমঙ্গলে ১৭২টি পূজামণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নিরাপত্তার বিষয়ে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “জেলার সব পূজামণ্ডপে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।”