কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে পাঁচ মাস আগে নিখোঁজ হওয়া ২১ বছর বয়সী এক তরুণকে হত্যার অভিযোগে তার চার বন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, ড্যান্ডি সেবনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে আরিফ মিয়া ওরফে সালমান নামের ওই তরুণকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। প্রমাণ মুছে ফেলার জন্য মরদেহটি নরসুন্দা নদীর কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) জেলা পুলিশ কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানান।

পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রামের গোলাপ মিয়ার দুই পুত্র সাকিব (১৮) ও মাফি (১৫); এছাড়া মৃত মোতালেবের ছেলে রফিক (৪০) এবং শামছুদ্দিনের ছেলে রমজান মিয়া (৩৫)।

ঘটনার সূত্র ধরে পুলিশ সুপার জানান, গত ১৮ মে সন্ধ্যায় সালমান বাড়ি থেকে ইলিমান বাজারের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত পরদিন হোসেনপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার স্বজনরা।

জিডির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। তদন্তের এক পর্যায়ে সালমান এবং তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মুঠোফোনের কল রেকর্ড ও চলাফেরার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। পুলিশ সুপার জানান, এই বিশ্লেষণের মাধ্যমেই সালমানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার বন্ধুদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ছেলের নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় গত ১৬ অক্টোবর হোসেনপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন সালমানের বাবা ফজলুর রহমান।

মামলা দায়েরের পর ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাহার মিয়ার নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল অভিযান চালায়। এই অভিযানে পাকুন্দিয়ার বিশ্বনাথপুর গ্রাম থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন উপপরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেন।

পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “পাঁচজন মিলে ড্যান্ডি সেবন করার সময় তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সালমান বাঁশ দিয়ে মাফিকে আঘাত করেন। পরে বাঁশটি কেড়ে নিয়ে চারজন সালমানকে পিটিয়ে হত্যা করেন।” প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছেন যে, সালমানকে হত্যার পর মরদেহটি গুম করার উদ্দেশ্যে তারা নরসুন্দা নদীর কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে হোসেনপুর উপজেলার শাহেদল ইউনিয়নের হাতিমের স্কুলের পাশে নরসুন্দা নদী থেকে কঙ্কালের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। উদ্ধার করা আলামতের মধ্যে ছিল মাথার খুলি, বুকের পাঁজরসহ মোট ৭৭টি হাড় এবং একটি গেঞ্জি।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে উদ্ধার করা গেঞ্জি দেখে সালমানের মা সালমা কঙ্কালটি তার ছেলের বলে শনাক্ত করেছেন। তবে চূড়ান্ত পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কঙ্কালটির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর তা ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ সুপার। গ্রেপ্তারকৃতদের ইতিমধ্যে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তাদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে।