সবুজ পাতার খামের ভেতর/ হলুদ গাঁদা চিঠি লিখে/ কোন্ পাথারের ওপার থেকে/ আনল ডেকে হেমন্তকে?’ সবুজ পাতার খামে হলুদ গাঁদা যেন চিঠি লিখে জানিয়ে দেয় হেমন্তের আগমনী বার্তা। দূর কোন পাথারের ওপার থেকে কে ডেকে আনে এই ঋতুকে, কবি সুফিয়া কামালের ‘হেমন্ত’ কবিতার পঙ্ক্তিতে সেই প্রশ্নই ধ্বনিত হয়েছে।
শরতের পায়ে–পায়ে এসেছে হেমন্ত। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ, এই দুই মাস মিলে বাংলার চিরায়ত ছয় ঋতুর চতুর্থ ঋতু। আজ শনিবার কার্তিকের প্রথম দিন। শরতের শুভ্র মেঘ এখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, এরই মধ্যে প্রকৃতিতে লেগেছে বদলের ছাপ। রাত গভীর হলে ধানের পাতা ও ঘাসের ডগায় জমে শিশির। ভোরের বাতাসে শীতের আভাস, দিন ফুরোলে কুয়াশার নরম পর্দায় আড়াল হয় সূর্য। ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে দিন।
হেমন্তের আগমন সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তরের জনপদে। পঞ্চগড় থেকে মুক্তকণ্ঠের সাংবাদিক রাজিউর রহমান জানালেন, সন্ধ্যা হলেই বইছে শীতল বাতাস। শেষ রাতে বেশির ভাগ মানুষকে ঘুমাতে হচ্ছে হালকা কাঁথা জড়িয়ে।
শুধু পঞ্চগড় নয়, দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোতেও গাছের পাতায় শিশির জমতে পারে। শেষ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত কোথাও কোথাও কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশও দেখা যেতে পারে। হেমন্তের প্রথম তিন দিনের আবহাওয়া কেমন থাকবে, জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক আরও জানালেন, এ সময় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। তাঁর পূর্বাভাস, দেশের উত্তরাঞ্চলে আবহাওয়া যেমনই থাকুক, উপকূলীয় এলাকায়, বিশেষ করে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে হতে পারে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি।
২.হেমন্তের সঙ্গে বাংলার মানুষের ফসলের সম্পর্ক সেই প্রাচীনকাল থেকেই। ধান কাটা, মাড়াই, সেদ্ধ করা, উঠানে শুকানো, তারপর গোলায় তোলা, কিষান-কৃষানির ব্যস্ততার শেষ থাকে না। নতুন ধান ঘরে উঠলে শুরু হয় নবান্নের আয়োজন। কোথাও কোথাও এখনো শোনা যায় ঢেঁকির শব্দ, ঘরে ঘরে তৈরি হয় পিঠা-পায়েস।
এই ঋতুতে খেজুরগাছে কলসি বাঁধার প্রস্তুতি নেন গাছিরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই নামানো হয় রাতভর জমে থাকা শীতল রস। পানি কমে আসা খাল-বিলে জেলেদের জালে ধরা পড়ে দেশি মাছ। তবে গ্রামীণ জীবনের চেনা এসব দৃশ্য এখন আর সবখানে আগের মতো সহজলভ্য নয়। শহরের মানুষের কাছে এগুলো অনেকটাই স্মৃতি, আর গ্রামের কোথাও কোথাও এখনো জীবনের অংশ।
ঋতুবদলের প্রভাব পড়ে সবজির বাজারেও। একসময় ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো কিংবা শিমের জন্য অপেক্ষা করতে হতো শীতকাল পর্যন্ত। এখন শরৎ ও হেমন্তেই বাজারে দেখা মেলে শীতের অনেক সবজির। আগাম চাষ ও নতুন নতুন জাতের কারণে মৌসুম শুরুর আগেই বাজারে আসছে এসব সবজি। তবে আগেভাগে বাজারে এলেই যে সবার নাগালে আসছে, তা নয়। মৌসুমের শুরুতে অনেক সবজির দাম থাকে বেশ চড়া।
হেমন্তের প্রকৃতিতে মিশে থাকে একধরনের প্রশান্ত সৌন্দর্য। দুপুরের রোদ থাকে কোমল, আকাশজুড়ে অনেক সময় নির্মল নীল। গাছতলায় ঝরে পড়ে শিউলি, শিশিরভেজা ঘাসে ভোরের আলো চিকচিক করে। শরতের শিউলি আর কাশফুল ধীরে ধীরে আড়ালে গেলে বাগানে ফুটতে শুরু করে গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, কসমস। ফুলের রং আর রূপের বদলেই যেন ধরা পড়ে এক ঋতুর বিদায়, অন্য ঋতুর আগমন।
এ সময় দূরদেশ থেকে উড়ে আসে পরিযায়ী পাখিরা। মাঠ, জলাভূমি আর আকাশে কিছুদিনের জন্য বসে তাদের আসর।
হেমন্তে অনেকে বেরিয়ে পড়েন পাহাড়, সমুদ্র কিংবা চায়ের দেশের পথে। তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ সবার সমান নয়। একই ঋতু কারও জীবনে নিয়ে আসে ভ্রমণের আনন্দ, কারও কাছে তা নিতান্তই দৈনন্দিন জীবনের আরেকটি অধ্যায়।
৩.বাংলার বর্ষা যেন রবীন্দ্রনাথের আর হেমন্ত জীবনানন্দ দাশের। তাঁর কবিতায় সকালের রোদ ধানের ওপর মাথা রেখে শুয়ে থাকে, কার্তিকের মাঠে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। জীবনানন্দের কবিতা মনে করিয়ে দেয়, হেমন্তকে বুঝতে হলে শুধু প্রকৃতির দিকে তাকালে চলে না; দেখতে হয় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কও।
হেমন্ত তাই কেবল একটি ঋতু নয়। এটি ফসলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্তি আর প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে জীবনের মানিয়ে নেওয়ার গল্প। শহরের মানুষ পাকা ধানের গন্ধ থেকে দূরে থাকলেও প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই মাঠ, সেই কৃষকের শ্রম। ঋতুর সৌন্দর্য আমাদের ক্ষণিকের মুগ্ধতায় ভাসায় আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক মনে করিয়ে দেয়, আমাদের অস্তিত্বের শিকড় আসলে কোথায়।
হেমন্ত আসে নিঃশব্দে, অথচ তার ছাপ পড়ে বাংলার ঘরে ঘরে, মাঠে-প্রান্তরে, মানুষের জীবন ও জীবিকায়।