সন্ধ্যা নামতেই পুকুরপাড়ের অন্ধকারে জ্বলে উঠল আলো। সেখানে দৃশ্যমান হলো বিশাল আকৃতির দুটি সাপ—একটি শাঁখামুটি এবং অন্যটি গুই। পাশাপাশি প্রদর্শিত হচ্ছে বেজি, গন্ধগোকুল, ভোঁদড়, কাঠবিড়ালি, কুমির, মদনটাক, প্রজাপতি, ফড়িং এবং রুই-কাতলাসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। বাঁশ ও কাপড়ের সমন্বয়ে তৈরি এই শিল্পকর্মগুলো দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁও জেলার ভূল্লী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের পুকুরপাড়ে এই ব্যতিক্রমী দৃশ্যের অবতারণা করা হয়। স্থানীয় গ্রামের প্রায় ৫০ জন বাসিন্দা মিলে এসব প্রাণীর অবয়ব তৈরি করেছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশ সদস্যই নারী। দুর্গাপূজার উৎসবকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অনুশীলনধর্মী প্ল্যাটফর্ম ‘গিদরী বাউলি ফাউন্ডেশন অব আর্টস’ হারিয়ে যেতে বসা এসব প্রাণীর এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। মূলত প্রান্তিক ও নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমসাময়িক শিল্পীদের মেলবন্ধন তৈরি এবং গ্রামীণ লোকশিল্প ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে ‘গিদরী বাউলি’।
শরতের শেষ বিকেলে সূর্যের আলো মিলিয়ে যাওয়ার পর যখন পুকুরপাড়ে প্রাণীগুলোর ভেতরের আলো জ্বলে ওঠে, তখন সেই আলোর টানেই ভিড় জমাতে শুরু করেন মানুষ। সন্ধ্যা সাতটার দিকে ১৩টি প্রাণীর মোট ২৬টি অবয়ব নিয়ে আয়োজকেরা গ্রামের কামাতপাড়ায় পৌঁছান। সেখান থেকেই শুরু হয় এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, যাতে বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুরা অংশগ্রহণ করেন। শোভাযাত্রাটি গ্রামের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে শেষ পর্যন্ত পূজামণ্ডপে গিয়ে শেষ হয়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ করতালি দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ প্রদান করেন। পরবর্তীতে দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে এসব শিল্পকর্ম দেখেন এবং প্রাণীগুলোর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের বিষয়ে জানতে আগ্রহী হন। আয়োজকেরা দর্শকদের কাছ থেকে এসব প্রাণী সংরক্ষণের অঙ্গীকার গ্রহণ করেন এবং পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন ধরনের গীত পরিবেশন করা হয়।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রদর্শনী প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলবে এবং আগামী মঙ্গলবার এতে সমাপ্তি ঘটবে।
এই বিশেষ আয়োজন সম্পর্কে গিদরী বাউলি ফাউন্ডেশন অব আর্টসের সভাপতি কামরুজ্জামান স্বাধীন বলেন, ‘পরিবেশগত নানা কারণে অনেক প্রাণী মানুষের আশপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় গল্প ও লোকজ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এসব শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে প্রাণীগুলোর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের চিন্তা ও উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটেছে। এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্কের কথাই নতুন করে আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই।’
পরিবেশগত নানা কারণে অনেক প্রাণী মানুষের আশপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় গল্প ও লোকজ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে এসব শিল্পকর্ম তৈরি করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীতে প্রাণীগুলোর হারিয়ে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষের চিন্তা ও উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটেছে।
আয়োজকেরা আরও জানান, চার দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে গ্রামের চারটি ভিন্ন এলাকা থেকে শোভাযাত্রা বের করা হবে। এই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ হলো বিষধর সাপেরও শত্রু হিসেবে পরিচিত ৩৩ ফুট লম্বা একটি শাঁখামুটি সাপ, যা বাঁশ, সুতলি ও কাপড় দিয়ে তৈরি এবং হলুদ-কালো ডোরাকাটা রঙের।
শিল্পীদের একজন আমল টুডু জানান, শাঁখামুটি অন্য সাপ খেয়ে বেঁচে থাকে। কালাচ, চন্দ্রবোড়া ও গোখরার মতো বিষধর সাপও এর খাদ্য। ফলে প্রকৃতিতে শাঁখামুটির সংখ্যা কমে গেলে বিষধর সাপের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। খাদ্যশৃঙ্খল ঠিক রাখতেও এই সাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ঠাকুরগাঁও শহর ঘোষপাড়ায় বসবাসকারী এবং পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক শহীদ জাকিরুল হক চৌধুরী এই আয়োজনে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘হারিয়ে যেতে বসা প্রাণীদের প্রতিকৃতি দেখে ভালো লেগেছে। এমন আয়োজন থেকে মানুষ কিছুটা সচেতন হলে আমাদেরই উপকার। যখন পরিবেশ সংরক্ষণের কথা এলাকার সব শ্রেণির মানুষ জেনে অঙ্গীকার করে, তখন আমাদের মধে৵ আশার আলো জেগে ওঠে।’
অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষক মাজেদ জাহাঙ্গীর মনে করেন, একটি প্রজাতি বা দেশি জাত বিলুপ্ত হওয়া মানে জীববৈচিত্র্যের একটি চিরস্থায়ী ক্ষতি। তিনি বলেন, প্রাণী ও মানুষের যৌথ স্বাস্থ্যের সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ধারণাটি হলো ‘ওয়ান হেলথ’। অর্থাৎ প্রাণীর স্বাস্থ্য, পরিবেশের সুস্থতা ও মানুষের স্বাস্থ্য একটি অপরটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জলাতঙ্ক, বার্ড ফ্লু কিংবা নিপাহ ভাইরাসের মতো মহামারি প্রমাণ করে প্রাণীর সঠিক পরিচর্যা ও বাসস্থান নিশ্চিত না করলে মানবজাতিও সুরক্ষিত নয়।