রাজধানীর বনানী পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতিমা দর্শনে ভিড় করছেন সব বয়সী মানুষ। উৎসবের আমেজে মণ্ডপজুড়ে এখন কেবল আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিমার সামনে প্রণতমুদ্রে প্রার্থনা করছেন, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে দেখছেন মণ্ডপের নান্দনিক সাজসজ্জা। আবার অনেকে মণ্ডপের শৈল্পিক কারুকার্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন এবং সেলফি নিচ্ছেন।

এই আনন্দময় পরিবেশে দেখা হয় নয়নী সোমের সঙ্গে। গত বছর তাঁর ছোট ছেলে বিক্রম বিশ্বাসের বয়স ছিল মাত্র ২৯ দিন, তাই এত ছোট শিশুকে নিয়ে পূজামণ্ডপে আসা সম্ভব হয়নি তাঁর। তবে এবার স্বামী বিনয় বিশ্বাস, তিন বছর বয়সী বড় ছেলে রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ও এক বছর বয়সী বিক্রমকে নিয়ে বনানী পূজামণ্ডপে এসেছেন তিনি। আজ শুক্রবার বিকেলে কথা বলার সময় দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে পূজার আনন্দ ভাগ করে নিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন নয়নী। তাঁর কাছে এবারের পূজা বিশেষ আনন্দের। দুই সন্তানের দিকে তাকিয়ে নয়নী সোম বলেন, ‘এ বছর দুই ছেলেকে নিয়ে পূজায় আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে। গত বছর ছোটটা একদম ছোট ছিল, তাই বের হতে পারিনি। এবার পরিবারের সবাই মিলে ঘুরছি, তাদের সঙ্গে নতুন স্মৃতি তৈরি হচ্ছে, ছবি তুলছি—সব মিলিয়ে এবারের পূজার আনন্দ অন্য রকম।’

নয়নী সোমদের বাড়ি বাড্ডায়। তাঁর স্বামী বিনয় বিশ্বাস একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

শিশুদের উপস্থিতিতে মণ্ডপজুড়ে উৎসবের আমেজ ছিল আরও বেশি। সেখানে দেখা মেলে সাভার থেকে আসা একটি পরিবারের। অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার বিকর্ণ কুমার চৌধুরী তাঁর স্ত্রী, মেয়ে, ছোট ভাই, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এবং ছোট ভাইয়ের দুই মেয়েসহ মোট আট সদস্যের একটি দল নিয়ে বনানী পূজামণ্ডপে এসেছেন। তাঁদের দিনটি শুরু হয়েছিল সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রতিমা দর্শনের মাধ্যমে। সেখান থেকে রামকৃষ্ণ মিশন হয়ে অন্যান্য মণ্ডপে ঘুরতে ঘুরতে তাঁরা বনানীতে পৌঁছান বলে জানান বিকর্ণ কুমার চৌধুরী।

পেশাগত জীবনে দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন বিকর্ণ কুমার চৌধুরী। আগে পূজার দিনগুলোতে দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকলেও অবসরের পর এবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পূজার আয়োজন উপভোগ করছেন তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে এবারের আয়োজন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বেশ সুসংগঠিত। বিকর্ণ কুমার চৌধুরী বলেন, ‘পরিবেশ অনেক সুন্দর, প্রস্তুতিও মনোমুগ্ধকর। এক কথায়, সবকিছুই মনোমুগ্ধকর।’

এই পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য রাইকা, যে কিন্ডারগার্টেনে পড়ে, সে জানায় বড়দের সঙ্গে পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখতে তারও খুব ভালো লাগছে।

বনানী পূজামণ্ডপে এবার দেবী দর্শনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সামনে উঠে এসেছে নদী, পানি ও জলকেন্দ্রিক জীবন-সংস্কৃতির গল্প। মণ্ডপের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ভেতরের সাজসজ্জা—সবখানেই ফুটে উঠেছে ‘জলজ’ ভাবনার ছাপ। আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল কেবল নান্দনিক মণ্ডপ তৈরি করা নয়, বরং পানির গুরুত্ব, নদীর সংকট এবং জলকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীর হারিয়ে যেতে থাকা জীবনধারা নিয়ে মানুষকে সচেতন করা।

গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় জানান, ২০০৮ সালে এই মণ্ডপে পূজা শুরু হয় এবং এ বছর এটি ১৯তম বছরে পদার্পণ করেছে। এবারের থিম ‘জলজ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অথচ ধীরে ধীরে নদ-নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। নদী ও পানিকে ঘিরে যেসব জনগোষ্ঠীর জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেগুলোও নানা কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই বাস্তবতা সামনে আনতেই জলকে এবারের পূজার মূল ভাবনা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।’

মণ্ডপের প্রবেশপথটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন দর্শনার্থীরা একটি জলাধারের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করছেন। ভেতরে মাছ ধরার সরঞ্জাম, শেওলা এবং জলকেন্দ্রিক নানা উপকরণের মাধ্যমে নদী ও পানির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিমার পেছনে রয়েছে শঙ্খ, আর তার সামনে অধিষ্ঠিত দেবী দুর্গা। সাজসজ্জার প্রতিটি অংশে প্রকৃতি, পানি ও মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গল্প বলা হয়েছে।

বিনয় গোপাল রায় আরও জানান, এই থিমের সঙ্গে সরাসরি ধর্মীয় কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে পানির সংকট ভবিষ্যতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সংকট সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং জলাধার রক্ষায় নাগরিকদের দায়িত্বশীল করে তোলাই এবারের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘আমরা বার্তা দিতে চাই, ঢাকা শহরে যাঁরা থাকি কিংবা দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা বসবাস করি, আমরা যেন জলাধারগুলো নষ্ট না করি। আমরা সবাই যেন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করি।’

আয়োজকদের দাবি, মণ্ডপের সাজসজ্জায় পরিবেশবান্ধব চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। পুরো কাঠামোটি টেকসই উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং খাবার পরিবেশনের জন্য একবার ব্যবহারযোগ্য পাত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে বনানীসহ গুলশান বিভাগের প্রধান পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. মামুনুর হক জানান, নিয়মিত মোতায়েনের বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীদের যেকোনো সমস্যায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। মোবাইল ফোন হারানোসহ বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, মণ্ডপের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও ছাদে পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন এবং পূজার দশমী পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে। দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সদস্যদের নিয়মিত পালা করে পরিবর্তন করা হবে। পাশাপাশি পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সভার মাধ্যমে তাঁদের পর্যবেক্ষণ এবং পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এডিসি মামুনুর হক জানান, এখন পর্যন্ত নিরাপত্তাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। পুলিশ, পূজা উদ্‌যাপন কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত সহযোগিতায় উৎসবটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।