সকালের ব্যস্ততা শুরু হতেই ময়মনসিংহ নগরের টাউন হল থেকে গাঙ্গিনারপাড়ের দিকে এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে। সামান্য পথ পাড়ি দিতে কখনো কয়েক দফা থামতে হয়, কখনো একই জায়গায় আটকে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। সামনে-পেছনে সারি বেঁধে থাকা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, মিশুক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যান সব মিলিয়ে সড়ক যেন চলার চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গায় পরিণত হয়েছে। স্টেশন রোড, চরপাড়া, নতুন বাজার, জিরো পয়েন্ট ও পাটগুদাম সেতুর আশপাশের চিত্রও প্রায় একই।

একসময় স্বল্প খরচে গন্তব্যে পৌঁছানোর সহজ মাধ্যম হিসেবে নগরবাসীর আস্থা অর্জন করেছিল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের চলাচলে এই যান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সেই সুবিধার আড়ালেই বড় হয়ে উঠেছে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চাপ, ভাড়া নিয়ে বিরোধ, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং সড়কে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ।

প্রশ্ন উঠেছে যে যান নগরবাসীর যাতায়াত সহজ করার কথা, সেটিই কেন প্রতিদিনের দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে? আর নগরের সড়কে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাদের, তাদের বিভিন্ন উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হচ্ছে না কেন?

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, নগরে নিবন্ধিত তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। এর মধ্যে ইজিবাইক ৫ হাজার ৯৬৮টি, মিশুক ৫ হাজার ৬০৮টি এবং অটোরিকশা ৫ হাজার ৪০০টি। তবে জেলা ট্রাফিক পুলিশের হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। নিবন্ধনের বাইরে প্রতিদিন আরও ২২ থেকে ২৫ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে। সব মিলিয়ে নগরে প্রায় ৪০ হাজার অটোরিকশা চলছে বলে দাবি ট্রাফিক পুলিশের।

অর্থাৎ শুধু অটোরিকশার হিসাবেই নিবন্ধিত সংখ্যার বাইরে বিপুলসংখ্যক যানবাহন সড়কে রয়েছে। এর সঙ্গে ইজিবাইক, মিশুক, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যান যুক্ত হলে সড়কের ওপর চাপ কতটা বাড়ে, তা ব্যস্ত মোড়গুলোতে দাঁড়ালেই স্পষ্ট হয়। সিটি করপোরেশন সূত্রের দাবি, নতুন করে অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও একই নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক যান সড়কে চলাচল করছে।

১৮৬৯ সালে ময়মনসিংহ পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগ গঠনের পর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শহরটির গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরুর পর নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ও জনপ্রত্যাশা দুটিই বেড়েছে। কিন্তু নগরের বিস্তৃতি ও মানুষের চলাচল বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সড়ক, গণপরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কতটা উন্নত হয়েছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

ময়মনসিংহ শহরের ভেতরে ১০টি রেলক্রসিং রয়েছে। ট্রেন চলাচলের সময় এসব ক্রসিংয়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। সংকীর্ণ সড়কে একবার যানজট সৃষ্টি হলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের একাধিক সড়কে। এর সঙ্গে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং মোড়ে মোড়ে যানবাহন জমে থাকার প্রবণতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

নগরবাসী জানান, অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও যাত্রী ওঠানো-নামানোর স্থান নির্ধারণ, ডিজিটাল বা দৃশ্যমান ভাড়ার তালিকা প্রকাশ, চালকদের প্রশিক্ষণ, বয়স যাচাই, বৈধ নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র পরীক্ষা এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। শহরের বাইরে থেকে আসা যানবাহনের জন্য উপযুক্ত স্থানান্তরকেন্দ্র (ট্রান্সফার পয়েন্ট) ও সংযোগ পরিবহনের ব্যবস্থা করা গেলে নগরের ভেতরে অপ্রয়োজনীয় প্রবেশ কমানো সম্ভব। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট চালক-মালিক সংগঠনের দায়িত্বও সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

নগরের গাঙ্গিনারপাড় এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শামীম আহমেদ জানান, প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য তাকে অটোরিকশার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু যানজটের কারণে অল্প দূরত্বে যেতেও দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হয়। কখনো কখনো চালকেরা গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই বেশি ভাড়া দাবি করেন; প্রতিবাদ করলে শুরু হয় তর্কাতর্কি। তার ভাষ্য, “অটোরিকশা বন্ধ করে দিলে আমাদেরই সমস্যা হবে। কিন্তু যে যার মতো চললে, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামালে এবং ইচ্ছেমতো ভাড়া চাইলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? নিয়ম থাকলে তা সবার জন্যই কার্যকর করতে হবে।”

শহরের চরপাড়া এলাকার গৃহিণী আফরোজা খাতুন বলেন, সন্তানকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনা-নেওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয় সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ে। তার অভিযোগ, কিছু চালক হঠাৎ করে মোড় ঘুরিয়ে দেন, চলন্ত যানবাহনের সামনে চলে আসেন কিংবা যাত্রী নেওয়ার জন্য মাঝসড়কে গাড়ি থামিয়ে দেন। এতে যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। তিনি বলেন, “শুধু গাড়ির সংখ্যা কমালেই হবে না, চালকদেরও নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতে হবে। শিশুদের নিয়ে রাস্তায় বের হলে নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত।”

নগরের পাটগুদাম এলাকায় অটোরিকশা চালান রাব্বি মিয়া। তার দাবি, যাত্রী পরিবহন করেই তাঁকে সংসার চালাতে হয়। প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে বের হলেও যানজটে আটকে থেকে কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশ নষ্ট হয়; আয় কমে গেলে সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, “আমরাও চাই সড়কে নিয়ম থাকুক। তবে বৈধ ও অবৈধ গাড়ি আলাদা করে দেখতে হবে। সবাইকে একসঙ্গে বন্ধ করে দিলে আমাদের পরিবার চলবে কীভাবে? আগে ঠিক করতে হবে কারা বৈধভাবে চলবে, কোথায় চলবে এবং কত ভাড়া নেবে।”

আরেক চালক রিপন মিয়া বলেন, নগরে অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চালকদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। যাত্রী পাওয়ার আশায় অনেক চালক একই স্থানে অপেক্ষা করেন বা অন্য গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ান। তবে এসব অনিয়মের জন্য কেবল চালকদের আয়ের চাপকে দায়ী করলে চলবে না। তার মতে, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড, রুট ও ভাড়ার নিয়ম কার্যকর হলে চালক ও যাত্রী উভয়েরই সুবিধা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যানজট কমাতে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন আগে থেকেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার রঙ ও চলাচলের তারিখভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাটারির লাল অটোরিকশা ও তিন ব্যাটারির হলুদ মিশুক বিজোড় তারিখে চলবে। আর পাঁচ ব্যাটারির সবুজ অটোরিকশা ও আকাশি রঙের তিন ব্যাটারির মিশুক চলবে জোড় তারিখে। চিকন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য প্রতিদিন চলার সুযোগ রাখা হয়েছে।

ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা, বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা ও কার্যকর আইন প্রয়োগ সবকিছুকে একই সুষম পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে নগরবাসীর কাছে একসময় আশীর্বাদ হয়ে ওঠা এই বাহন ক্রমেই দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হবে। আর তখন প্রশ্নটি থেকেই যাবে ময়মনসিংহের সড়ক কি নগরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচলের জন্য, নাকি নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের দখলে থাকার জন্য?

ময়মনসিংহ জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. গোলাম মাওলা জানান, সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনের বাইরে প্রতিদিন ২২ থেকে ২৫ হাজার অটোরিকশা শহরে চলাচল করছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার অটোরিকশা চলছে। তার ভাষ্য, “গত দুই দশকে শহরে বহুতল ভবন বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় সড়ক বাড়েনি। একটি আদর্শ শহরে সড়কের জন্য ২৫ শতাংশ জায়গা থাকা প্রয়োজন হলেও ময়মনসিংহে রয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এই সীমিত সড়কে বিপুলসংখ্যক যান চলাচল করায় যানজট নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।” তার মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সড়কের অপ্রতুলতা, রেলক্রসিংয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা, নির্দিষ্ট স্থানে যানবাহনের জটলা এবং বিকল্প গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতাও এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

সিটি কর্তৃপক্ষ বলছে, নগরে কার্যকর বিকল্প গণপরিবহন না থাকায় অটোরিকশার ওপর মানুষের নির্ভরতা কমানো সহজ নয়। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য অনেকের কাছে এটিই সবচেয়ে সহজলভ্য বাহন। ফলে একদিকে অতিরিক্ত অটোরিকশার চাপ কমানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখার চ্যালেঞ্জ দুটি বিষয়ই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শহরের বাইরের অটোরিকশা নগরের ভেতরে প্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। রঙভিত্তিক চলাচল তদারকি, নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং মালিক-চালকদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নগরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, যানজটের টেকসই সমাধানের জন্য অটোরিকশা ও ইজিবাইককে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।