ঠাকুরগাঁওয়ে ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) নামক একটি বৃহৎ বেসরকারি সংস্থার প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামানের কাছে লেখক একবার অনুরোধ করেছিলেন যে, সংস্থার কয়েক একর জমিতে দেশের সব প্রজাতির গাছের অন্তত দুটি করে চারা রোপণ করা সম্ভব কি না। তাঁর সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে ড. জামান লেখককে সেখানে দুর্লভ প্রজাতির গাছের একটি উদ্যান গড়ে তোলার দায়িত্ব অর্পণ করেন। গত দুই বছর ধরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত বছরের রোপণ করা চারাগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে এবং আরও কিছু বিরল প্রজাতির চারা রোপণের উদ্দেশ্যে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঠাকুরগাঁও সফর করেন লেখক।
সফরের এক পর্যায়ে দেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহী বেশ কিছুদিন ধরে লেখককে অনুরোধ করছিলেন, ‘ঠাকুরগাঁও আসুন, খ্যাঁকশিয়াল দেখাব।’ ইএসডিওর জমিতে চারা রোপণের কাজ শেষ করে তিনি রাহীর সঙ্গে খ্যাঁকশিয়াল দেখতে যান। সেখানে গিয়ে লক্ষ্য করেন, খ্যাঁকশিয়ালদের সঙ্গে রাহীর এক ধরণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের খুব কাছেই একটি স্ত্রী খ্যাঁকশিয়াল বসে ছিল এবং হাঁটাহাঁটি করছিল, যা তাদের দেখে বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছিল না। কিছু সময় পর একটি পুরুষ খ্যাঁকশিয়ালও সেখানে উপস্থিত হয় এবং লেখক দুটি প্রাণীকেই একসঙ্গে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন।
ঠিক সেই মুহূর্তেই লেখক লক্ষ্য করেন, প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি বড় প্রাণী হেঁটে যাচ্ছে। সূর্যের বিপরীত দিকে থাকায় প্রথমে প্রাণীটিকে পাতিশিয়াল বলে মনে হয়েছিল। তবে পরক্ষণেই সেই ভুল ভেঙে যায়। লেখক দেখতে পান, সেটি আসলে একটি বড়সড় বিড়াল। এটি যে সাধারণ কোনো পোষা বিড়াল নয়, তা বোঝার জন্য বিশেষ কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। পরবর্তীতে ছবির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রাণীটি ছিল একটি বনবিড়াল।
সূর্যের বিপরীত দিকে দাঁড়িয়েই লেখক ছবি তুলতে শুরু করেন। বনবিড়ালটি একবার মাটিতে বসে বেশ আরাম করল। তারপর একাকী আবার হাঁটতে শুরু করল। জঙ্গলের দিকে চলে যাওয়ার সময় এর কিছুটা ভালো ছবি পাওয়া গেল।
যে স্থানে বনবিড়ালটির দেখা মিলেছিল, সেটি ছিল একটি নদীর তীরবর্তী এলাকা। নদীর পাড়জুড়ে বিস্তৃত ছিল বেশ কিছু জঙ্গল এবং তার পাশেই ছিল আখের খেত। চারপাশের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নির্জন এবং কিছুটা ভুতুড়ে। তবে এটি কোনো অতিপ্রাকৃত ব্যাপার ছিল না, বরং চারপাশের নিস্তব্ধতাই জায়গাটিকে এক রহস্যময় রূপ দিয়েছিল। সেখানে বড় বড় কয়েকটি গাছও ছিল।
প্রায় চল্লিশ বছর আগেও দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বনবিড়ালের দেখা পাওয়া যেত। এই প্রাণীটি বাড়ির হাঁস-মুরগি, কবুতর এবং এমনকি ছাগলের ছোট বাচ্চাও শিকার করে খেত। গ্রামীণ জীবনে এটি ছিল অত্যন্ত পরিচিত একটি প্রাণী। অঞ্চলভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন নাম প্রচলিত ছিল; যেমন রংপুরের কোথাও একে ‘গাড়োয়া’, আবার কোথাও ‘বাড়বিলাই’ বলা হতো।
গ্রামের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে থাকা জঙ্গল কিংবা বাঁশঝাড়ে বনবিড়াল আশ্রয় নিত। সন্ধ্যায় তারা ‘বাব, বাব’ স্বরে একধরনের ডাক দিত। অনেক অঞ্চলে বনবিড়ালের এই ডাককে কুডাক হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অনেকের ধারণা, বনবিড়াল ডাকলে অমঙ্গল ঘটে। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, এর মাংস খেলে শরীরের বিষব্যথা দূর হয়, যদিও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন ধারণার কোনো স্বীকৃতি নেই।
সময়ের পরিক্রমায় গ্রাম থেকে জঙ্গল হারিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বনবিড়ালের প্রধান খাদ্য যেমন বড় ইঁদুর ও বিভিন্ন পাখি এখন আর সহজলভ্য নেই। আবাসস্থলের সংকটের পাশাপাশি মানুষের নিষ্ঠুরতাও এই প্রাণীর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে; কোথাও বনবিড়াল দেখা গেলেই অনেকে দল বেঁধে তাকে ধাওয়া করে মেরে ফেলেন।
বনবিড়াল গাছে উঠতে পারে এবং সাঁতারও কাটতে পারে। লেখক উল্লেখ করেন যে, এই প্রাণীটি মানুষের ওপর আক্রমণ করেছে এমন কথা তিনি কখনো শুনেননি। তাই যেসব এলাকায় এখনো বনবিড়ালের দেখা মেলে, সেখানকার মানুষের দায়িত্ব হলো প্রাণীটিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং এর বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বনবিড়ালের ইংরেজি নাম জঙ্গল ক্যাট এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম \IFelis chaus\I। এটি একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর গায়ের রং ধূসর-বাদামি এবং লেজ ও পায়ে রয়েছে ডোরাকাটা দাগ। মুখে সাদা গোঁফও দেখা যায়।
যে জঙ্গলে বনবিড়ালটির দেখা পাওয়া গেল, সেটি আর কতদিন টিকে থাকবে তা বলা কঠিন। লেখক আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আবার কবে বনবিড়াল দেখতে পাবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই; হতে পারে এটাই ছিল তাঁর শেষ দেখা। আলোকচিত্রী রেজাউল হাফিজ রাহী পাখি, খ্যাঁকশিয়াল ও সাপের ছবি তুলতে অনেক সময় ব্যয় করলেও সেদিনই জীবনে প্রথমবারের মতো বনবিড়ালের ছবি তুললেন। এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে, প্রাণীটি বর্তমানে কতটা দুর্লভ হয়ে পড়েছে।
লেখক মনে করেন, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন বনবিড়ালকে শুধু ছবিতেই না দেখে, প্রকৃতিতেও দেখতে পায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বনবিড়াল ও তার আবাসস্থল সংরক্ষণে আমাদের সবার আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়