আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রাম তাঁর পদত্যাগের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির রাজধানী তিরানায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এই উত্তাল পরিস্থিতির এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বিক্ষোভকারীদের গুরুতর অভিযোগ, দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা চরম দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তারা শিক্ষা খাতের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করছেন। এর পাশাপাশি আলবেনিয়ার দক্ষিণ উপকূলের কিছু অংশ তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার–সমর্থিত একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণের উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে তারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, একটি বিলাসবহুল রিসোর্ট উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রীষ্মজুড়ে তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ চালিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের উদ্বেগের কথা কেউ শোনেনি।
তবে এদি রামের সরকার দুর্নীতির এই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দিলেও পদত্যাগের দাবিটি নাকচ করে দিয়েছেন।
এক লিখিত বিবৃতিতে রাম বলেন, ‘আমার দায়িত্ব হলো জনগণের কথা শোনা, যুক্তিসংগত উদ্বেগগুলোর সমাধান করা এবং আলবেনিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অন্য কিছু করা হলে তা আলবেনীয় জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হবে, যারা আমাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদসংক্রান্ত আলোচনা শেষ করার জন্য একটি শক্তিশালী জনমত দিয়েছে।’
সরকারি সম্পত্তিতে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী রাম। অন্যদিকে, কিয়ারা নামের এক শিক্ষার্থী জানান, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, কর্মসংস্থানের অভাব এবং কথিত দুর্নীতিই তাঁদের এই তীব্র ক্ষোভের মূল কারণ।
গতকাল রাস্তার অনেকের মতো নিজের মুখ মাস্কে ঢেকে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নামই এখন দুর্নীতির সমার্থক। পরিচিত কেউ না থাকলে নিজের যোগ্যতার ক্ষেত্রেও চাকরি পাওয়া অসম্ভব।’
টানা তিন দিন ধরে চলা এই বিক্ষোভ এদি রামের শাসনকালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত বছর চতুর্থ মেয়াদে জয়ী হওয়া এই নেতার নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান ভিত্তি ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদ লাভ। রাজধানী ও সংলগ্ন এলাকায় সহিংসতা শুরু হওয়ায় দেশটির সংসদ অধিবেশন বাতিল করতে হয়েছে।
কেন্দ্রীয় স্ক্যান্ডারবেগ স্কোয়ারে পর্যটকদের উপস্থিতিতেই পুলিশ পালিয়ে যাওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। স্থানীয় টপ-চ্যানেল টিভির ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, শকোদ্রা শহরে এক পুলিশ কমান্ডার গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে দুরেস, এলবাসান, কুকেস এবং ভ্লোরা শহরেও।
বিক্ষোভকারী এবং পেশায় আইনজীবী লুলজিম তানুশি বলেন, ‘এই সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত, একজন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধানমন্ত্রী এটি পরিচালনা করছেন। রাম ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং মানুষের জীবন ধ্বংস করেছেন। অতীতে তাঁদের কথা না শোনায় মানুষ এখন এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছে।’
আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা ওই রিসোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পর এই সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়। গত জুলাইয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীরা দাবি করেছিলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য তাঁদের জমি বেআইনিভাবে বিক্রি করা হয়েছে। যে ব্যক্তি জমিটি বিক্রি করেছিলেন, তিনি মাদক পাচারের দায়ে প্রসিকিউটরদের ওয়ান্টেড তালিকায় ছিলেন। তবে তাঁর আইনজীবী এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
উল্লেখ্য, জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে অনিয়মের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এই বিরোধে তিনি সরাসরি জড়িত নন।
দুর্নীতি কেলেঙ্কারির কারণে গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলবেনিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি মাদক ও অস্ত্র পাচারের অর্থ বৈধ করার একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা ইইউতে যোগদানের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে। বলকান দেশগুলোর মধ্যে মন্টিনিগ্রোর সঙ্গে আলবেনিয়া বর্তমানে ইইউতে যোগদানের প্রক্রিয়ায় শীর্ষে রয়েছে এবং ২০২৮ সালের মধ্যেই সদস্যপদ পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই অশান্তি মূলত ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া শিক্ষার্থী আন্দোলনেরই একটি অংশ। ফ্রান্সেও হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত শিক্ষক ও উন্নত অবকাঠামোর দাবিতে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ ও স্কুল অবরোধ করে আসছে। তাদের যুক্তি, জরাজীর্ণ ভবন এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থী শিক্ষাব্যবস্থেকে ধ্বংস করছে।