ক্লাব ফুটবলের আঙিনায় সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আর্থিকভাবে সবচেয়ে লাভজনক টুর্নামেন্ট হিসেবে পরিচিত উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোকে নিয়ে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার ফরম্যাটে গত তিন মৌসুম ধরে ৩৬টি দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

উয়েফার হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে অংশ নেওয়া ক্লাবগুলোর মধ্যে বণ্টনের জন্য মোট ২৪৩ কোটি ৭০ লাখ ইউরো বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে এই অঙ্কটি চূড়ান্ত নয়; উয়েফার প্রকৃত আয়ের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এই অর্থের পরিমাণ কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।

চ্যাম্পিয়নস লিগে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য উয়েফা মূলত তিনটি ভিন্ন খাতে অর্থ বরাুদ্দের ব্যবস্থা করেছে। প্রথমত, টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য প্রতিটি দল একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পায়। দ্বিতীয়ত, ম্যাচের ফলাফল (জয় বা ড্র) এবং নকআউট পর্বের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে পুরস্কারের অর্থ বৃদ্ধি পায়। তৃতীয়ত, সম্প্রচারস্বত্ব এবং ক্লাবের ইউরোপীয় পর্যায়ে পূর্ববর্তী পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে আয়ের একটি বড় উৎস রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘ভ্যালু পিলার’। এই বহুমুখী ব্যবস্থার কারণে শিরোপাজয়ী ক্লাবটি ঠিক কত টাকা পাবে, তার কোনো একক নির্দিষ্ট অঙ্ক আগে থেকে বলা সম্ভব নয়।

১. অংশগ্রহণের ফি: চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে খেলার সুযোগ পাওয়া প্রতিটি ক্লাব অংশগ্রহণ ফি হিসেবে ১ কোটি ৮৬ লাখ ২০ হাজার ইউরো পায়। এই অর্থ পাওয়ার জন্য ম্যাচের ফলাফল বা টুর্নামেন্টের পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার কোনো শর্ত নেই।

২. ম্যাচের ফলাফল ও নকআউট পর্বের পুরস্কার: এই খাতের আয় সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ম্যাচের ফলাফল, লিগ পর্বের চূড়ান্ত অবস্থান এবং নকআউট পর্বে দলটির অগ্রগতির ওপর। লিগ পর্বে প্রতিটি দল মোট ৮টি ম্যাচ খেলে। এখানে প্রতিটি ম্যাচে জয়লাভ করলে দল পায় ২১ লাখ ইউরো এবং ম্যাচ ড্র হলে পায় ৭ লাখ ইউরো।

একটি প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ম্যাচ জিতলে উয়েফার খরচ হয় ২১ লাখ ইউরো, কিন্তু ড্র হলে দুই দল মিলিয়ে মোট ১৪ লাখ ইউরো খরচ হয়। তাহলে বাকি ৭ লাখ ইউরোর কী হয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে আয়ের আরেকটি বিশেষ পদ্ধতিতে। লিগ পর্বে ৩৬টি দলের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে উয়েফা মোট ৬৬৬টি ভাগে অর্থ বরাদ্দ করেছে। প্রতিটি ভাগের প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ইউরো। সেই হিসেবে লিগ পর্ব শেষে যে দল ৩৬তম বা সবার নিচে থাকবে, তারা এক ভাগের অর্থ অর্থাৎ ২ লাখ ৭৫ হাজার ইউরো পাবে। আর অবস্থান যত উপরের দিকে হবে, ভাগের সংখ্যাও তত বাড়বে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, তালিকার শীর্ষে থাকা দল ৩৬ ভাগের অর্থ বা ৯৯ লাখ ইউরো পাবে।

এছাড়া ড্র ম্যাচের কারণে যে ৭ লাখ ইউরো অব্যবহৃত থাকে, সেটিও দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হয়। ফলে লিগ পর্বের পয়েন্ট তালিকার ভিত্তিতে পুরস্কারের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়।

লিগ পর্বের পর ২৫তম থেকে ৩৬তম স্থানে থাকা ১২টি দল টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেবে। নবম থেকে ২৪তম স্থানে থাকা ১৬টি দল প্লে-অফ খেলবে, যেখান থেকে আটটি দল শেষ ষোলোয় উঠবে এবং বাকি আটটি দল বিদায় নেবে। অন্যদিকে, লিগ পর্বের প্রথম আটটি দল সরাসরি শেষ ষোলোয় খেলার সুযোগ পাবে। এরপর টুর্নামেন্টটি কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের দিকে এগোবে। এই প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করার জন্য দলগুলোর জন্য অতিরিক্ত অর্থের ব্যবস্থা রয়েছে।

৩. ভ্যালু পিলার: বড় ক্লাবগুলোর আয়ের বিশেষ উৎস: চ্যাম্পিয়নস লিগে আয়ের তৃতীয় এবং অন্যতম বড় উৎস হলো ‘ভ্যালু পিলার’। এই খাতে উয়েফা ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ইউরো বরাদ্দ করেছে। তবে এই অর্থ সব ক্লাবের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয় না। এখানে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, ক্লাবের নিজ দেশের সম্প্রচারবাজারের আর্থিক মূল্য এবং দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ক্লাবটির অতীত পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নির্ধারিত উয়েফা কোএফিশিয়েন্ট। এই দুইয়ের সমন্বয়েই ভ্যালু পিলারের অর্থ বণ্টন করা হয়।

এই কারণে রিয়াল মাদ্রিদ, বায়ার্ন মিউনিখ বা ম্যানচেস্টার সিটির মতো প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলো এই খাত থেকে তুলনামূলক অনেক বেশি অর্থ পায়। বিপরীতে, যারা প্রথমবারের মতো বা খুব কম অভিজ্ঞতা নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে অংশ নেয়, তাদের আয় তুলনামূলক কম হয়।

সার্বিকভাবে, চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জয়ের জন্য নির্ধারিত পুরস্কার ৬৫ লাখ ইউরো হলেও অংশগ্রহণ ফি, ম্যাচের ফলাফল, লিগ পর্বের অবস্থান, নকআউটের প্রতিটি ধাপ এবং ভ্যালু পিলারের অর্থ মিলিয়ে একটি সফল ক্লাবের মোট আয় ১০ কোটি ইউরোর অনেক বেশি হতে পারে।