প্রকাশনার এক দশক পূর্ণ করল জনপ্রিয় মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘বিজ্ঞানচিন্তা’। লেখক ও পাঠকদের উপস্থিতিতে কেক কাটার মাধ্যমে এই সাময়িকীর ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া লেখক ও পাঠকেরা তাঁদের পছন্দের এই সাময়িকীটি পড়ে নিজেদের ভালো লাগার কথা জানান এবং এর মাধ্যমে কীভাবে উপকৃত হয়েছেন, তা তুলে ধরেন। পাশাপাশি ‘বিজ্ঞানচিন্তা’কে আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে এবং সাধারণ মানুষের প্রিয় হয়ে উঠতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় পরামর্শও প্রদান করেন।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। কেক কাটার পূর্বমুহূর্তে উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র ১০ বছরের পথচলা এবং এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাঁদের ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। পুরো আয়োজনটিতে গান এবং কুইজের মাধ্যমে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে উদ্বোধন করেন মুক্তকণ্ঠের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ বাংলাদেশে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক একটি অসাধারণ ম্যাগাজিন। প্রতিবছর এর হাজার হাজার কপি বের হয় এবং ১০ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৭০-৮০ বছর বয়সী মানুষেরা পর্যন্ত এই ম্যাগাজিন পড়েন। এ ছাড়া অনলাইনে ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র ওয়েবসাইটে প্রতিদিন হাজারো পাঠক বিজ্ঞানবিষয়ক নানা লেখা পড়েন। এই পাঠকেরা নিজেদের আগ্রহ থেকেই বিজ্ঞান পড়েন, কোনো বিজ্ঞাপন থেকে তাঁরা ওয়েবসাইটে আসেন না। এটা সত্যিই বড় ব্যাপার।

‘বিজ্ঞানচিন্তা’র সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাঁদের ছাত্রজীবনে দেয়ালপত্রিকার প্রচলন ছিল। সেগুলোর মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের কথাগুলো বলতেন। নিজেদের চিন্তাগতভাবে উচ্চপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সেই চর্চাই পরবর্তী সময়ে ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র দিকে গেছে। তিনি আরও জানান, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র শুরু থেকেই উদ্দেশ্য ছিল, দেশের তরুণেরা যেন আরও উন্নত হতে পারেন এবং নিজেদের ও সমাজকে আরও এগিয়ে নিতে পারেন। পরে শিক্ষকেরাও যুক্ত হলেন, উৎসাহ দিলেন। এভাবেই ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ ১০ বছর পার করে এসেছে। এ মুহূর্তের কাজ ও দায়িত্ব হচ্ছে, সবাইকে ডিজিটাল সায়েন্সের দিকে এগিয়ে নেওয়া। নইলে পেছনে পড়ে থাকতে হবে।

সাময়িকীর নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার উল্লেখ করেন যে, পাঠকই ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র ১০ বছরের দীর্ঘ পথচলার মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আরও অনেক সামনে যেতে চাই। সেই যাত্রায় সবাইকে পাশে পাব বলে আশা করি।’

অনুষ্ঠানে অনুভূতি, পরামর্শ, কুইজ ও গানের আয়োজন ছিল। ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র এই বিশেষ দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন প্রখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিদ অধ্যাপক দীপেন ভট্টাচার্য। শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র পাঠকসংখ্যা আরও বাড়ুক, পাঠকেরা যাতে এটিকে নিবিড়ভাবে মনে স্থান দেন।

সাময়িকীর সহসম্পাদক উচ্ছ্বাস তৌসিফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে লেখক ও পাঠকদের অনেকেই তাঁদের বক্তব্য পেশ করেন। লেখক তানজিনা হোসেন ১০ বছর ধরে বিজ্ঞানমনস্ক পাঠক তৈরিতে ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। পেশায় চিকিৎসক তানজিনা বলেন, ‘“বিজ্ঞানচিন্তা” যে পাঠকসমাজ তৈরি করেছে, এটা তৈরি করা সহজ বিষয় নয়। আমি মনে করি, আমাদের বিজ্ঞানী হতে হবে না, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হতে হবে। “বিজ্ঞানচিন্তা” সেই কাজই করে যাক।’

অন্যদিকে বিজ্ঞানলেখক আসিফ মনে করেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ সব ধরনের পাঠককে একটি প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ যেভাবে ভারসাম্য তৈরি করেছে, সেখানে যথেষ্ট সহনশীলতা আছে। এমন প্ল্যাটফর্ম বিকশিত হওয়া দেশের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার।

লেখক ফারহানা মান্নান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ সবারই পড়া উচিত। দেশে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তৈরি হলে বিজ্ঞানভিত্তিক কাণ্ডজ্ঞান তৈরি হবে।

লেখক আবদুল গাফফার বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ বিজ্ঞানলেখক ও পাঠকদের এক ছাতার নিচে এনেছে ১০ বছর হয়ে গেল। মনে হয় যেন গতকাল। এ কারণেই বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালেখি বেড়েছে৷

বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের জন্য দুটি বিশেষ পরামর্শ দেন। প্রথম পরামর্শটি ছিল দেশের শিক্ষার্থীদের নতুন আবিষ্কার বা লেখা প্রকাশের জন্য ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র একটি বা অর্ধেক পাতা বরাদ্দ করার বিষয়ে; যেখানে শিক্ষকদের লেখাও স্থান পেতে পারে। দ্বিতীয় পরামর্শটি ছিল ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র উদ্যোগে স্কুলপর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন এবং বিশেষ দিবস উদ্‌যাপনের বিষয়ে।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পাঠক শিক্ষার্থীরাও তাঁদের অনুভূতির কথা জানান। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থী আরীব বিন ফারুক তিন বছর ধরে এবং সাইম ইবনে সারওয়ার গত বছর থেকে ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ পাঠের পাশাপাশি এর বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত আছেন। আরীব বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ তাকে গবেষণার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে। আর সাইম জানান, তিনি এখন নিয়মিত ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ পড়ছেন। রাফিউল ইসলাম নামের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা’ প্রকাশের পর তরুণদের অনেকের মধ্যেই বিজ্ঞান পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

আলোচনার ফাঁকে অনুষ্ঠানে দুটি কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যার একটি ছিল গণিত এবং অন্যটি বিজ্ঞান বিষয়ক। এছাড়া ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’ ও ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’—এই দুটি গান পরিবেশন করা হয়, যেখানে উপস্থিত সবাই শিল্পীদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন।