সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাস উপলক্ষে ‘বাংলাদেশ সাইবার রেজিলিয়েন্স ব্রিফিং ২০২৬’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে ব্রেইন স্টেশন–২৩ পিএলসির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ সাইবারস্টেশন। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বাংলাদেশের ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে থাকা তথ্যের ভয়াবহতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি, সরকারি খাত ও শিক্ষাঙ্গনের প্রায় ১৫০ জন প্রতিনিধি, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা এবং সাইবার নিরাপত্তা পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, দেশের ১৫টি ভিন্ন খাতের মোট ৭৬৭টি ডোমেইন পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রায় সবগুলোরই ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে পাওয়া গেছে। সেখানে অন্তত ১৭ হাজার ৩৬২ জন ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য এবং ১৮ লাখের বেশি ব্যবহারকারীর রেকর্ড ছড়িয়ে থাকার প্রমাণ মিলেছে। সাইবারস্টেশনের দাবি, এই পরিসংখ্যানগুলো মূলত সর্বনিম্ন হিসাব; প্রকৃত তথ্যের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উন্মুক্ত নাগরিক তথ্যের সবচেয়ে বড় অংশ পাওয়া গেছে সরকারি সেবা খাতের ডোমেইনগুলোতে। অন্যদিকে, তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে।
সাইবারস্টেশনের সাইবার নিরাপত্তা সেবাবিষয়ক প্রধান মোহিব্বুল মোক্তাদীর বলেন, ‘যে ঝুঁকি আমরা দেখতে পাই না, তা আমরা সামলাতে পারি না। আমাদের লক্ষ্য, প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বুঝতে পারে কোন তথ্য উন্মুক্ত হয়েছে এবং অপরাধীরা অপব্যবহার করার আগেই ব্যবস্থা নিতে পারে।’
ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর নির্বাহী পরিচালক এম জে ফেরদৌস বলেন, ‘২০ বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা তৈরি করেছি সাইবারস্টেশন, আমাদের নিজস্ব সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ। আজকের সেমিনারের উদ্দেশ্য ছিল দেশের সাইবার নিরাপত্তায় আমরা কোথায় আছি এবং সামনে কী কী উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তা পর্যালোচনা করা। বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব সাইবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এখানে আমাদের কোনো অবদান যদি কাজে লাগে, আমরা আন্তরিকভাবে সবার পাশে থাকতে চাই।’
অনুষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সাইবারস্টেশন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। তাদের তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আমার হয়েছে। এটি সাইবার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর প্রতিরোধ ও মোকাবিলার কৌশল তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
প্রযুক্তিবিদ মুনির হাসান ডার্কওয়াচের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর তৈরি ডার্কওয়াচের মতো দেশীয় প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে আমাদের সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করা উচিত। এ ধরনের উদ্যোগকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তায় তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।’
সেমিনারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ডার্ক ওয়েবে তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলার উপায় নিয়ে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরামর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহরিয়ার রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) স্পেশাল রেসপন্স ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক, বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম সচিব (আইসিটি) মো. ইমরান খান এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। প্যানেল আলোচনায় তথ্যের অপব্যবহার রোধ এবং এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান হামিদা কাজী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক রাজেশ পালিত, গ্রামীণ ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজ্জাদ হোসেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গ্রামীণফোনের সাবেক সিআইও মো. লুৎফর রহমান, মবিলের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) শাফকাত মাহমুদ এবং স্ট্রিম কানেক্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কর্নেল (অব.) মো. সোহেল রানা প্রমুখ।
ব্রেইন স্টেশন–২৩-এর ২০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে ওঠা সাইবারস্টেশন জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের কার্যক্রম তারা অব্যাহত রাখবে। সময়মতো ঝুঁকি শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে তারা উল্লেখ করেছে।