রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার অন্তর্গত দাসপাড়া এলাকায় জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে ৫৪ দিন আগে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি আর শোকের রেশ কাটেনি এলাকার মানুষের মনে। ফলে এবারের দুর্গাপূজায় কোনো আলোকসজ্জা বা জাঁকজমক নেই, বরং এক বিষণ্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে নিহত গণপতির নিজ পাড়ায়।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে দাসপাড়ার গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সংলগ্ন শ্রী শ্রী কালীমন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, মন্দির কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সাদামাটা একটি প্যান্ডেলে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি নিয়েছে। পুরো পাড়া জুড়ে উৎসবের সেই চিরচেনা আনন্দ-উল্লাস এবার অনুপস্থিত।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী বাঁধন দাস স্মৃতিচারণ করে বলেন, “গত বছর পূজোর প্যান্ডেলসহ পুরো মন্দিরে জমকালো আলোকসজ্জা ছিল। কিন্তু এ বছর গণপতি স্যারের পুরো পরিবার হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ায় সাদামাটা আয়োজন করা হয়েছে। কারও মনেই আনন্দ নেই, শুধু পূজা উদ্যাপনের জন্য সামান্য কিছু লাইটিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তা পাল জানান, পুরো এলাকায় এখন এক গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি বলেন, “আগে পূজোয় কত ডেকোরেশন হতো, কিন্তু এবার তেমন কিছুই নেই। প্রতিবার এখানে প্রতিমা তৈরি করা হলেও এবার বাইরে থেকে প্রতিমা বানিয়ে আনতে হয়েছে। আমাদের সবার মনেই গভীর শোক।”
শ্রী শ্রী কালীমন্দিরের দাসপাড়ার সহসাধারণ সম্পাদক রামনাথ চন্দ্র দাস জানান, সাধারণত এক মাস আগেই তাদের মন্দিরে সাজসজ্জার কাজ শুরু হয়ে যেত এবং বড় আকারে প্যান্ডেল তৈরি করা হতো, যা দেখতে শহরের অনেক মানুষ আসতেন। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর তাদের পূজার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। তিনি বলেন, “আমাদের এই মন্দিরে শহর থেকে প্রচুর দর্শনার্থী আসতেন। তবে মর্মান্তিক এই ঘটনার শোকের কারণে আমাদের এবার পূজোর কোনো ইচ্ছেই ছিল না। কিন্তু গ্রামবাসী বললেন আমাদের বউ-বাচ্চারা কোথায় যাবে? অঞ্জলি দেওয়া ও পূজাপাঠ তো করতেই হবে। উৎসব না করলে তো পুরো একটি বছর নষ্ট হয়ে যাবে। আজ আছি কাল নেই, জীবনের তো ভরসা নেই। তাই এসব চিন্তা করেই সাদামাটাভাবে পূজার আয়োজন করেছি।”
দাসপাড়ার শ্রী শ্রী কালীমন্দিরের সভাপতি অমূল্য চন্দ্র দাস বলেন, “আমাদের মনে বিন্দুমাত্র আনন্দ নেই। আমরা জীবনেও ভাবিনি এখানে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আমাদের বাপ-দাদারা গেছেন, আমরাও চলে যাচ্ছি, আবার নতুন প্রজন্মও আছে। তাই এবার পূজোটা যতটা সম্ভব সাদাসিধে ও ঘরোয়াভাবে করার প্রস্তুতি নিয়েছি।”
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে কথা বলেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মু. মাহবুবুর রশীদ। তিনি জানান, গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় ডিএনএ রিপোর্ট হাতে এসেছে। তিনি বলেন, “আমরা শিগগিরই এ ঘটনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেবো।” এছাড়া রংপুর নগরীর পূজা মণ্ডপগুলোতে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।