প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার কক্সবাজারে লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে এই কেন্দ্রটি এখন নানা অনিয়ম ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো একাডেমিক জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তিরাই এখানে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যাদের মধ্যে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও রয়েছেন। চাকরির পাশাপাশি প্রশিক্ষক হিসেবে তারা মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছেন বলে জানা গেছে।
এই তালিকায় রয়েছেন মোহাম্মদ কামরুল হাসান, যিনি বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক হিসেবে কর্মরত। প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে পড়াশোনা করলেও তিনি ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা এবং অ্যাডভান্স আইসিটির মতো জটিল বিষয়গুলোর রিসোর্স পারসন বা বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কেন্দ্রটির পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে তিনি মূল চাকরির বাইরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়েছেন।
মুক্তকণ্ঠের সংগৃহীত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণের তুলনায় এই সেন্টারে প্রশিক্ষণের ব্যয় বহুগুণ বেশি। এই বিষয়ে কামরুল হাসানের বক্তব্য জানতে মুক্তকণ্ঠ কয়েক দফায় চেষ্টা করে। তার দপ্তরে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়া গত ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবর তিন দিন ধরে ফোন এবং বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
সেন্টারের বর্তমান উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. কামরুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে জানান, ভবিষ্যতে যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের নিয়োগ দিতে একটি ট্রেইনার পুল গঠন করা হবে। তিনি বলেন, “বিষয় সংশ্লিষ্ট ও অভিজ্ঞদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে ট্রেইনারদের একটি পুল গঠন করা হবে। ইতোমধ্যে আমরা গুগল ফর্মের মাধ্যমে আবেদন আহ্বান করেছি। এখন থেকে যোগ্য ও বিষয় সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ছাড়া কেউ ট্রেইনার হতে পারবেন না।”
মোহাম্মদ কামরুল হাসানের ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ৩১ অক্টোবর ২০১৯ থেকে ২ নভেম্বর ২০২২ পর্যন্ত হবিগঞ্জ ও কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ বিভাগের পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং গত বছর কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালকের দায়িত্ব পান। নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি ঢাকা থেকে কক্সবাজার গিয়ে ‘ইংরেজি বিষয়ে যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন’, ‘ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ’ ও ‘অ্যাডভান্স আইসিটি’র মতো বিষয়ে ক্লাস পরিচালনা করেছেন।
প্রশিক্ষণের মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রশিক্ষণার্থী বলেন, “কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ না হলেও বাধ্য হয়ে তাদের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এর ফলে সরকারের অর্থের অপচয় হলেও আমরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করতে পারছি না।”
উল্লেখ্য, আগে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। কিন্তু গত এক বছর ধরে স্থানীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ বন্ধ করে সব কার্যক্রম কক্সবাজারের এই সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ব্যয়ের অসংগতি প্রসঙ্গে উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “আমি গত জুলাইয়ে এখানে যোগদান করেছি। গত বছর বেশকিছু ট্রেনিং হয়েছে, তখন এই লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে সরকারি বিধি মোতাবেক কষ্ট সেন্টার ছিল না। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, কক্সবাজারের কাছে বরাদ্দ দিয়ে ট্রেনিংগুলো চালিয়েছে।”
মুক্তকণ্ঠের হাতে থাকা নথিতে ব্যয়ের এক বিস্ময়কর চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ২৫ জন শিক্ষকের ১০ দিনের ‘ইনডাকশন’ প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছিল ২ লাখ ৭৯ হাজার ৩৮০ টাকা। অথচ কক্সবাজার লিডারশিপ ট্রেনিং সেন্টারে ৩০ জন শিক্ষকের ১০ দিনের ‘ইংরেজি বিষয়ে যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রশিক্ষণে খরচ ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৮২ হাজার ২০০ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই ইংরেজি প্রশিক্ষণের মোট আটটি ব্যাচে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চেয়ে মোট ৬৪ লাখ ২২ হাজার ৫৬০ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে।
আইসিটি প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলা পর্যায়ে ৪৮০টি ব্যাচে ১৪ দিনের ‘আইসিটি ইন এডুকেশন’ প্রশিক্ষণে প্রতি ব্যাচে ২৫ জন শিক্ষকের জন্য ব্যয় হয়েছিল ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৭০০ টাকা। বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কক্সবাজার সেন্টারে ৩০ জন শিক্ষকের মাত্র পাঁচ দিনের ‘অ্যাডভান্স আইসিটি’ প্রশিক্ষণে খরচ হয়েছে ৭ লাখ ৭০ হাজার ১০০ টাকা।
প্রধান শিক্ষকদের লিডারশিপ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও খরচের ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা পর্যায়ে ২৫ জন প্রধান শিক্ষকের ১৪ দিনের প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছিল ৫ লাখ ৫৮০ টাকা, যেখানে কক্সবাজার সেন্টারে ৩০ জন প্রধান শিক্ষকের পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণে বরাদ্দ করা হয়েছে ৭ লাখ ৭১ হাজার ৩০০ টাকা।
সেন্টারটির প্রশাসনিক জটিলতা ও হস্তান্তরের বিষয়ে উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “এই ট্রেনিং সেন্টারটি এখনো অফিশিয়ালি হস্তান্তর হয়নি। সরকারের অনেক দপ্তর এটি নিতে চেয়েছিল। সেন্টারটি যাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতছাড়া না হয় তাই গত বছর দ্রুত ট্রেনিং শুরু হয়েছিল। এজন্য কিছু অনিয়ম, অসংগতি হয়ে থাকতে পারে।”
অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে তার যুক্তি হলো, সারা দেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসার, এটিইও, ইউআরসি ও পিটিআই-এর মতো বিভিন্ন দপ্তরে অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। সবাইকে বিদেশে পাঠানো সম্ভব নয় বলে তাদের অ্যাডভান্স লেভেলের প্রশিক্ষণের জন্য কক্সবাজারে পাঠানো হয়। কামরুজ্জামানের মতে, সারা দেশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্সবাজারে প্রশিক্ষণ করালে ব্যয় কিছুটা বাড়লেও তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়।