চট্টগ্রাম নগরে গত সেপ্টেম্বর মাসে ল্যাপটপ, মুঠোফোন এবং ১৭০টি ডিভাইসসহ ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। এই ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তাঁরা ঘটনার বিষয়ে মুখ খুলছেন না। এসব ডিভাইস ব্যবহার করে তাঁরা কী করেছেন এবং তাঁদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা উদঘাটনের জন্য ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। এর আগে এই ধরনের পরীক্ষার জন্য একমাত্র ভরসা ছিল ঢাকায় অবস্থিত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

তবে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বিভিন্ন ডিভাইসের ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আর ঢাকায় পাঠাতে হবে না; এই পুরো প্রক্রিয়াটি চট্টগ্রামেই সম্পন্ন করা যাবে। নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনের ভেতরে সিআইডি কার্যালয়ের পাশে গতকাল বুধবার দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘সাইবার পুলিশ সেন্টার’ উদ্বোধন করেন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ হাজার ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৬৭টি মামলা বিচারাধীন এবং ২৮টির ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। এছাড়া ৬৫টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি এবং ১৪টি মামলা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে।

আদালতের পাশাপাশি থানায়ও মামলা দায়ের করা হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১টি জেলায় সাইবার আইনে মোট ৫০টি মামলা হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলার চেয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বেশি আগ্রহী থাকেন। অনেকে আইনি ঝামেলায় জড়াতে চান না অথবা লোকলজ্জার ভয়ে মামলা করতে পিছপা হন। এই প্রকল্পটির পরিচালক সিআইডি ঢাকার অতিরিক্ত ডিআইজি সরদার রুকন উজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “৫৯ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি সহায়তায় সাইবার পুলিশ সেন্টার করা হয়েছে।”

সরেজমিনে দেখা গেছে, চারতলা এই ভবনের বিভিন্ন কক্ষে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও ল্যাবের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম বসানো হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে মোবাইল ফরেনসিক ল্যাব, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এছাড়া এখানে ফরেনসিক গ্রহণ কেন্দ্র এবং একটি সভাকক্ষ রয়েছে। সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার সালাহ উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এখন থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য মুঠোফোন, ল্যাপটপসহ নানা ডিভাইস ঢাকা পাঠাতে হবে না। চট্টগ্রামেই পরীক্ষা করা যাবে। এতে সময় কম লাগবে।” তিনি আরও বলেন, “ফেসবুকে কেউ গুজব কিংবা অপপ্রচার চালালে সহজে শনাক্ত করা যাবে এই সাইবার সেন্টারে প্রযুক্তির সাহায্য। এতে সাইবার অপরাধ রোধ ও আগাম ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ফলে অপরাধ কমবে।”

৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট চট্টগ্রাম। এই মামলার দায়িত্বে থাকা উপপুলিশ কমিশনার শামীম হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কাউন্টার টেররিজমে তদন্তাধীন বেশির ভাগ মামলা সাইবার–সংক্রান্ত। এসব মামলার তদন্ত করতে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা খুবই প্রয়োজন। এর জন্য ঢাকা সিআইডিতে পাঠানো হয়। এতে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়। এখন যেহেতু চট্টগ্রামে চালু হচ্ছে, তাতে সময় কম লাগবে।”

পুলিশ কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, এই সাইবার পুলিশ সেন্টারের মাধ্যমে কম্পিউটার ও ডিজিটাল স্টোরেজ মিডিয়া থেকে গোপনীয় ডেটা উদ্ধার ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। এখানে মূল্যবান ডেটা সংরক্ষণ এবং স্থানান্তর করা যাবে। অপরাধ ঢাকতে বা আলামত গায়েব করতে মুছে ফেলা তথ্য, মেমোরি ডাম্প, হার্ড ড্রাইভে ফাঁকা ফোল্ডার এবং বিভিন্ন জটিল ফাইলের ফরেনসিক পরীক্ষা করবে এই সেন্টার। মুঠোফোন ফরেনসিকের আওতায় অপরাধকাজে ব্যবহৃত মুঠোফোন ও যেকোনো ডিভাইস অন্তর্ভুক্ত। ল্যাবের মাধ্যমে মুঠোফোন, ট্যাব, জিপিএস ডিভাইস, ড্রোন ইত্যাদি থেকে ডেটা উদ্ধার ও বিশ্লেষণ করা যাবে।

এই সেন্টারের মাধ্যমে যেসব ডেটা উদ্ধার ও বিশ্লেষণ করা হবে, তার মধ্যে রয়েছে এসএমএস এবং এমএমএস বা এ–জাতীয় মুছে ফেলা ডেটা, কল লগ ও লিস্ট, ফোন আইএমইআই ও ইএসএন সম্পর্কিত তথ্য, ওয়েব ব্রাউজিং, ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক সেটিংস, জিওলোকেশন তথ্য, ই-মেইল এবং ইন্টারনেট মিডিয়া ও ফর্ম, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং পরিষেবা, পোস্টসহ বিভিন্ন ডার্ক ও ডিপ ওয়েবসাইটের হোয়াইট কলার ক্রিমিনালদের অপরাধের আলামতগুলো। এছাড়া অ্যাপ ডেটা, মেসেঞ্জার ডেটা ও ক্লাউড ড্রাইভে সংরক্ষিত ডেটাগুলো বিশ্লেষণ করে অপরাধ ও অপরাধীদের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হবে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট চট্টগ্রামের উপপরিদর্শক রাসিব খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সাইবার অপরাধের ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, অনলাইন আর্থিক জালিয়াতি, অ্যাকাউন্ট দখল, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানির মতো অপরাধের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের নতুন নতুন ধরন সামনে আসছে। এসব অপরাধ শনাক্তের জন্য ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া সম্ভব নয়। চট্টগ্রামে সাইবার পুলিশ সেন্টার হওয়ায় সাইবার অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।”