বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত এবং মুনাফা—উভয় খাতেই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সর্বশেষ এক বছরের হিসেবে এসব ব্যাংকের মোট আমানত কমেছে ১১১ কোটি টাকা এবং মুনাফার পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসেবে সাড়ে ১৭ শতাংশের কাছাকাছি।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আজ বুধবার প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম: প্রবণতা ও পরিচালনাগত বিশ্লেষণ’। উক্ত প্রতিবেদনে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ এবং মুনাফার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাস অর্থাৎ জুনের শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৮৭ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ১১১ কোটি টাকা কমেছে। মুনাফার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। গত জুনের শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মুনাফার পরিমাণ নেমে এসেছে ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকায়, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা ৪৯৪ কোটি টাকা কমেছে। তবে আমানত ও মুনাফা এভাবে কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংক মোট ৬৭টি শাখা এবং ৬টি উপশাখার মাধ্যমে সেবা প্রদান করছে। ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন (এইচএসবিসি), স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ (এসসিবি), সিটিব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, উরি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং ব্যাংক আলফালাহ।

বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের একটি বড় অংশই মূলত কম সুদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ। গত জুনের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশি ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের মধ্যে ৩২ হাজার ৮০১ কোটি টাকা এই ধরনের হিসাবে জমা ছিল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আমানত পাওয়া গেছে বিদেশি মুদ্রায় খোলা হিসাবে, যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। এছাড়া মেয়াদি বা স্থায়ী আমানতের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। সাধারণত স্থায়ী বা মেয়াদি আমানতে সুদহার বেশি হয়ে থাকে, তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে এই ধরনের আমানতের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়।

কম সুদের আমানত বেশি থাকা সত্ত্বেও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলো যথেষ্ট সতর্ক ও সংযত ভূমিকা পালন করছে। গত জুনের শেষে এসব ব্যাংকের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যেখানে গত বছরের জুন শেষে তা ছিল ৪৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। সেই হিসেবে এক বছরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর দেওয়া ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩৪৯ কোটি টাকা। এই ঋণের সিংহভাগই শিল্প খাতে ব্যয় করা হয়েছে। গত জুনে শিল্প খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পরিবহন ও নির্মাণ খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ সবচেয়ে কম। পরিবহন খাতে গত জুনের শেষে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ কোটি টাকা এবং নির্মাণ খাতে ছিল ৪২৮ কোটি টাকা।