ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতার জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের চরম হেনস্তার অভিযোগ তুলে জাতিসংঘকে চিঠি লিখেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের (মমতাপন্থী) রাজ্যসভার সদস্য সমীরুল ইসলাম। সম্প্রতি উত্তর কলকাতার এই কলোনিতে পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।

জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের উচ্ছেদের নোটিশ ঘিরে বর্তমানে এক বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মঞ্চ পর্যন্ত পৌঁছেছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট ট্রাস্টের অধীনে প্রায় ৩ হাজার ৪৭৮ বর্গমিটার জমির ওপর গড়ে ওঠা এই কলোনিতে দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য মুসলিম পরিবার বসবাস করে আসছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সদস্য সমীরুল ইসলাম এই পুরো ঘটনাটিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করে একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্সে’ চিঠিটি পোস্ট করে সমীরুল অভিযোগ করেছেন, মে মাসে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হলে রাজনৈতিক প্রতিশোধের অংশ হিসেবে জ্যোতিনগর কলোনির বাসিন্দাদের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সমীরুলের দাবি, কলোনির বাসিন্দারা একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক না হওয়ার কারণেই তাঁদের ওপর এ ধরনের অমানবিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কলোনিতে থাকা পাঁচটি পানির কল দিয়ে আগে প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন পানি পাওয়া যেত। কিন্তু গত ২৯ জুলাই থেকে কলগুলো সম্পূর্ণ শুকনা পড়ে রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, পানির পাইপলাইন বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ২৬ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত কলকাতা পৌর সংস্থার মাধ্যমে কলোনির সামনের রাস্তায় কিছু পাইপলাইন সংস্কারের কাজ চালানো হয়। সেই সময় এলাকার পানি সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল এবং স্থানীয় মানুষের পক্ষ থেকে পৌর সংস্থায় কোনো পূর্ব অভিযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও ২৮ জুলাই রাত ১১টার দিকে রাস্তা মেরামতের কথা বলে কলোনির মূল পানির সংযোগটি রাতের অন্ধকারে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

বাসিন্দারা জানান, পরদিন সকাল থেকেই পুরো এলাকা পানিশূন্য হয়ে পড়ে। পানির সংকটের পাশাপাশি একই দিনে কলোনির বিদ্যুৎ সরবরাহও হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা চূড়ান্ত দুর্ভোগের মুখে পড়ে।

কলোনির বাসিন্দারা জানান, বিদ্যুৎ বণ্টনকারী সংস্থা ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই করপোরেশন বা সিইএসসি মূল সড়ক থেকে অবৈধ বিদ্যুৎ–সংযোগ নেওয়া হচ্ছে এমন সন্দেহে সংযোগটি কেটে দিয়েছিল। যদিও কলোনির প্রতিটি বাড়িতে বৈধ মিটার ও আলাদা বিল পরিশোধের কাগজপত্র রয়েছে, তা সত্ত্বেও দীর্ঘ ১০ দিন তাঁদের বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একটি ক্লাবের প্রতিবাদ ও সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে এলাকাটিতে বিদ্যুৎ পরিষেবা আংশিক এবং পরে পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয়। তবে আড়াই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও পানির সংকট অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

এই বিষয়ে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা স্থানীয় কাউন্সিলর, থানার পুলিশ এবং বিজেপির স্থানীয় বিধায়ক রিতেশ তিওয়ারির দ্বারস্থ হলেও কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি কলোনির বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করতে যাননি। উল্টো বিধায়ক রিতেশ তিওয়ারি তাঁর কাছে যাওয়া নারী প্রতিনিধিদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি এই পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করার জন্য দায়ী নন এবং তিনি পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধারে কোনো উদ্যোগ নেবেন না।

বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণার পরপরই এই জনপ্রতিনিধি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিনি আগামী পাঁচ বছর বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য কোনো কাজ করবেন না বা কোনো প্রশংসাপত্র দেবেন না। তাঁর এই ঘোষণা স্থানীয়দের মধ্যে প্রবল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসদলীয় রাজ্যসভার সদস্য সমীরুল ইসলাম জাতিসংঘের উদ্দেশে লেখা তাঁর চিঠিতে মনে করিয়ে দিয়েছেন, পর্যাপ্ত ও নিরাপদ পানি এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়ার অধিকার জাতিসংঘের স্বীকৃত সার্বজনীন মানবাধিকারের একটি মৌলিক অংশ। পানিসংকটের কারণে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত কলোনিবাসীর মধ্যে নানা ধরনের সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পানি বন্ধ করে দেওয়া মানুষের বেঁচে থাকার মূল অধিকারের ওপর চরম আঘাত বলে উল্লেখ করে সমীরুল বলেন, “কোনো বাড়তি সুযোগ-সুবিধা বা বিশেষ অগ্রাধিকার নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন টিকে থাকার জন্য যে ন্যূনতম পরিষেবা দরকার।” পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে তিনি জাতিসংঘকে বিষয়টি তদন্ত করারও অনুরোধ জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে জমি খালি করা এবং বস্তি উচ্ছেদের একটি পরিকল্পিত চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করছেন কলোনির বাসিন্দারা। আইনি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জ্যোতিনগর কলোনির জায়গা প্রকৃতপক্ষে কলকাতা বন্দরের মালিকানাধীন জমি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পোর্টের এস্টেট অফিসার এই জমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের একটি নির্দেশ জারি করেন, যা কলোনিবাসীরা জানতে পারেন জুনের দিকে। এরপরই আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি আইনি লড়াইয়ের রূপ নেয় এবং কলকাতা হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানির পর আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেন।

কলোনিবাসীর পক্ষের আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ও শামিম আহমেদের মতে, পাবলিক প্রিমাইসেস অ্যাক্ট ১৯৭১ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে তার বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করার আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী সেই নোটিশ না দিয়েই কলোনি খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল।

আইনজীবীদের যুক্তি, জমিটি বন্দরের হলেও তা মূলত সরকারি সম্পত্তি। এ কারণে সাধারণ মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে, ১৯৯০ সাল থেকে কলোনি গড়ে ওঠার কারণে ওই জমি বাবদ তাদের আনুমানিক ৬১ কোটি রুপির বেশি লোকসান হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১৯ লাখ টাকা করে তারা রাজস্ব হারাচ্ছে। এ ছাড়া কলোনিটিতে অনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক তার ও দাহ্য পদার্থের উপস্থিতির কারণে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়েছিল।

বর্তমানে পানি পরিষেবা পুনরুদ্ধারের জন্য বাসিন্দাদের আলাদা একটি আবেদন নগর দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পানি ও বিদ্যুৎ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে এলাকাটি যে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই ভুক্তভোগী কলোনিবাসীর।