অফিসের ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। তা দিয়ে নিজেদের প্রয়োজন মিটবে, বাড়তি বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয়ও হবে। এমন পরিকল্পনা নিয়ে সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসাতে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। দাপ্তরিক ভবনের পাশাপাশি হাটবাজার, মিলনায়তন, ডাকবাংলো ও বাসভবনের ছাদও এই উদ্যোগের আওতায় আসছে। তবে এত প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতির মান, কেনাকাটার স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনায় প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে ২০ বছরের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, এই সময়ে কোম্পানিগুলো বিনা মূল্যে রক্ষণাবেক্ষণ করবে। চুক্তি লঙ্ঘন করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও বিদ্যুৎ বিভাগ তদারকি করবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি তা কার্যকর করার প্রস্তুতিও প্রয়োজন। কোথায় কত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, কোনো ব্যবস্থা বন্ধ হলে কত দিনে মেরামত হচ্ছে এবং যন্ত্রাংশ বদলানোর দায়িত্ব কার—এসব নিয়মিত যাচাই করতে হবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতার ঘাটতি বিবেচনায় কারিগরি সহায়তা ও দক্ষ জনবলও নিশ্চিত করা দরকার।

অফিস থেকে হাটবাজারের ছাদে

স্থানীয় সরকার বিভাগের গত ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বরের পৃথক নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট ভবনে অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপসহ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর বাড়তি বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে বিদ্যুতের খরচ কমার পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়বে বলে আশা করছে বিভাগ।

নির্দেশনার আওতায় রয়েছে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ভবন, আঞ্চলিক কার্যালয়, বাসভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলো ও অতিথিশালা। করপোরেশনের অধীন মার্কেট ও হাটবাজারের স্থায়ী শেডে আয়তন বিবেচনায় প্যানেল বসাতে হবে। পৌরসভা ও জেলা পরিষদের ভবন এবং অধীন স্থাপনাগুলোতেও একই ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি সঠিক দামে কেনার কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কতটা আছে, তা বিবেচনা জরুরি। সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কেনাকাটায় গুরুত্ব দিলে প্রচলিত বিদ্যুৎ খাতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে। ঠিকাদার প্যানেল বসিয়ে চলে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে বা ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়লে দায় নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

উপজেলা পর্যায়ে পরিষদ ভবনের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান বা প্রশাসকের বাসভবন, কর্মচারীদের আবাসন এবং হাটবাজারের স্থায়ী শেড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এলজিইডির বিভিন্ন ভবন ও রাবার ড্যামের রক্ষণাবেক্ষণকক্ষের ছাদও ব্যবহার করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদের ভবনে নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আগামী বছরের ৩০ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদগুলো নিজস্ব আয়ের অর্থ ব্যবহার করেও উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে পারবে।

হাটবাজারে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে ইজারার অর্থ ব্যবহারের কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট হাটের উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত ১৫ শতাংশ এবং উপজেলার অন্য হাটবাজারের জন্য নির্ধারিত ১০ শতাংশ অর্থ এই কাজে ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে এ অর্থ থেকে ব্যাটারির খরচও বহন করা যাবে।

কোথায় কত বরাদ্দ

স্থানীয় সরকার বিভাগের নথি অনুযায়ী, পাঁচ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩৬৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে ১১৯ কোটি ৫৬ লাখ, উপজেলা পরিষদে ৯৯ কোটি, সিটি করপোরেশনে ৭৫ কোটি, পৌরসভায় ৬৩ কোটি ৭০ লাখ এবং জেলা পরিষদে ১২ কোটি ২০ লাখ টাকা।

মন্ত্রণালয়ের ২০ সেপ্টেম্বরের আদেশে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ১০ কোটি টাকা করে এবং অন্য ১১টি সিটি করপোরেশনকে ৫ কোটি টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আদেশে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনসহ উন্নয়নকাজের কথা থাকলেও সৌরবিদ্যুৎকে ব্যাপক অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। পৃথক তালিকায় ৪৯৫ উপজেলা পরিষদের প্রতিটিকে ২০ লাখ টাকা এবং ৬১ জেলা পরিষদের প্রতিটিকে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে সক্ষম প্রতিষ্ঠান নিজেদের রাজস্ব বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ ব্যয় করবে। অন্য প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। উভয় ক্ষেত্রেই স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে ২০ বছরের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি করতে হবে।

অর্থ ব্যয়ের জন্যও শর্ত রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দের আদেশে নির্ধারিত কার্যক্রম ছাড়া অন্য কাজে অর্থ ব্যয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অব্যয়িত অর্থ আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। উপজেলা পরিষদের অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হলে পূর্বানুমোদন নিয়ে রাজস্ব তহবিল ব্যবহারের সুযোগ আছে। সিটি করপোরেশনগুলোকে কাজের অগ্রগতি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পাঠাতে বলা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিক্রি করে খরচ তোলার আশা

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ভাষ্যমতে, নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ বিক্রির মাধ্যমে তিন থেকে চার বছরে প্রাথমিক বিনিয়োগ উঠে আসবে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে গ্রিডের ওপর নির্ভরতাও কমবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষ প্রণোদনা অনুযায়ী, নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে গ্রিডে দেওয়া বাড়তি বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের জন্য পাওয়া যাবে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। এই সুবিধা পেতে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ–ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। বিশেষ দরে বিদ্যুৎ কেনা হবে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

বিদ্যুৎ বিক্রির অর্থ প্রতি তিন মাস পরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ সব যন্ত্রপাতি হতে হবে নির্ধারিত মানের। অর্থাৎ প্যানেল বসানোর পাশাপাশি গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিক্রির প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

অবশ্য কেনাকাটার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তাঁর মতে, মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি সঠিক দামে কেনার কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কতটা আছে, তা বিবেচনা জরুরি। উৎপাদন ব্যয় ও ক্রয়মূল্য নির্ধারণেও স্বচ্ছতা এবং অংশীজনের মতামত নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

শামসুল আলমের আশঙ্কা, সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কেনাকাটায় গুরুত্ব দিলে প্রচলিত বিদ্যুৎ খাতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হবে। ঠিকাদার প্যানেল বসিয়ে চলে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে বা ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়লে দায় নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি

রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি হবে। এই চুক্তি অনুযায়ী ২০ বছর কোম্পানি বিনা মূল্যে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকৌশলী ও বিদ্যুৎ বিভাগ নিয়মিত তদারকি করবে।

এ উদ্যোগ নিয়ে মতামত দেওয়া আরেক বিশেষজ্ঞের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় দুর্বলতা সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ। সড়কবাতি, গণশৌচাগারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির পর নিয়মিত পরিচর্যা, যন্ত্রাংশ ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করার ঘাটতি থাকে। সৌরবিদ্যুতের প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, তার ও মিটারের নিরাপত্তাও পরিকল্পনায় রাখতে হবে। তাঁর পরামর্শ, প্রাথমিক বিনিয়োগের সঙ্গে পুরো মেয়াদের পরিচালনা, মেরামত, যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন ও নিরাপত্তার ব্যয় বিবেচনা করা দরকার। প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন করে উৎপাদন, বন্ধ থাকার সময়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, চুরির ঝুঁকি ও আর্থিক ফল যাচাই করা যেতে পারে। এরপর সেই অভিজ্ঞতায় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুতের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালে সচিবালয়ের ২ নম্বর ভবনে ৫০ কিলোওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ–ব্যবস্থা স্থাপন করেছিল রহিমআফরোজ। ডিপিডিসির সঙ্গে ২০ বছরের বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি ছিল। ফলে সরকারি ভবনে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের আগের অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ উদ্যোগে যুক্ত করাকে ইতিবাচক মনে করেন। তাঁর পরামর্শ, ঠিকাদারের যোগ্যতা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগে তদারকি সেল, হটলাইন ও কেন্দ্রীয় অনলাইন ড্যাশবোর্ড থাকা দরকার। মাঠপর্যায় থেকে নিয়মিত তথ্য এলে কোথায় উৎপাদন হচ্ছে, কোথায় বন্ধ, তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্যানেল বসানোর চেয়েও বড় বিষয় দীর্ঘ মেয়াদে নিয়মিত বিদ্যুৎ পাওয়া। চুক্তি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে এবং তদারকি না হলে ভালো উদ্যোগও ব্যর্থ হতে পারে। তখন অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে হতাশা তৈরি হবে।