২০০৫ সালের ৭ অক্টোবর মুক্তকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত  ‘প্রণমহি বঙ্গমাতা: ঢাকার মাজারে গাজির গান’ শিরোনামে সাইমন জাকারিয়ার এ লেখাটি আজ অন্য আলো পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

একসময় প্রায় নিয়মিতভাবেই ঢাকার বিভিন্ন মাজারে ঘুরেছিলাম। সেটা ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের কথা। সে সময় ঢাকার যে মাজারটির চরিত্র আমাকে সব থেকে অধিক আকর্ষণ করেছিল, সেটি মিরপুর এক নম্বরে অবস্থিত হজরত শাহ আলীর মাজার। এই মাজারের প্রসারিত এলাকার মধ্যে কিছু কিছু গাছপালার বিস্তার, জলাশয় আর ঘর-দালানের বিভিন্ন আকৃতি-বৈচিত্র্য আমাকে যতটা না মুগ্ধ করত, তারও অধিক মুগ্ধ হতাম প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আর রাতজুড়ে আলো-আঁধারির আবহে সুর-তালের গানের ইন্দ্রজালে, নাচের দোলায়, জিকিরের নিবিষ্টতায়। মারফতি বিশ্বাসের আর ধ্যানের এই মাজারে আমি বৃহস্পতিবার এলেই দশাগ্রস্তের মতো ছুটে যেতাম। শুনতাম গান:

‘আল্লাহ নবীর নাম লইয়া

আসরেতে দাঁড়াইলাম ;

বিসমিল্লাহ বলিয়া বুকের

জবান খুলিলাম..।’

আমি লক্ষ করে দেখেছি, শাহ আলীর মাজারে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ভক্তের উপস্থিতি। এই মাজারে আসা নিয়মিত ভক্ত-গায়েন শাখা-সিঁদুর পরিহিত বীণা রানীর গানের আসরের কথা এত দিনেও মনে সুস্থিরভাবেই গেঁথে আছে। আজ সে কথা থাক। আজ বলি শাহ আলীর মাজারের গাজির গানের কথা।

২০০২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের এক সন্ধ্যায় শাহ আলীর মাজারের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে কিছুক্ষণের জন্য একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে লালনের গান শুনে নিলাম, ‘পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়..।’ তারপর পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরে হেঁটে জলাশয় পার হয়ে পীর-ভক্তদের একেকটি আসরে গিয়ে জিকির আর ভক্তির গান শুনে শুনে মাজারের মূল উঠানে ফিরে আসি।

২০০২ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের এক সন্ধ্যায় শাহ আলীর মাজারের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকে কিছুক্ষণের জন্য একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে লালনের গান শুনে নিলাম, ‘পারে কে যাবি নবীর নৌকাতে আয়..।’ তারপর পশ্চিম দিকের রাস্তা ধরে হেঁটে জলাশয় পার হয়ে পীর-ভক্তদের একেকটি আসরে গিয়ে জিকির আর ভক্তির গান শুনে শুনে মাজারের মূল উঠানে ফিরে আসি। এবারে মাজার প্রাঙ্গণের মূল উঠানে বসা অসংখ্য আসরের মধ্যে হঠাৎ গাজির আশা পোতা একটি আসর দেখে ছুটে আসি তার দিকে। দেখি ধুতি পরা এক বৃদ্ধ গায়েন সাদা পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে পরনের সাদা ধুতির একটি আঁচল এক হাতে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে অন্য হাতে চামর দুলিয়ে নেচে নেচে ঠিকই গাজির গান গাইছেন।

আমি আমার হাতের টেপ রেকর্ডার অন করে গাজির গানের সেই আসরে বসে যাই। তবে গাজির গানের সে আসরকে একক অভিনয়রীতির পর্যায়ে ফেলার কোনো উপায় নেই। কারণ, আসরজুড়ে বাদ্যকর হিসেবে ঢোলক ধ্যানমগ্ন হয়ে তাল সংগত করছিল, সঙ্গে মন্দিরায় জুড়িদার হয়ে উঠেছে আরেকজন এবং অন্যজন সুরের ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে দিচ্ছিল হারমোনিয়াম বাজিয়ে। আসরজুড়ে তাদেরই দোহারকি করতে দেখেছি, এই আসরের উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা-ভক্তদের অনেকেই বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই দোহারকিতে অংশ নিয়ে থাকে। রাতে এশার আজান শোনা যেতেই আসরে একটুখানি বিশ্রাম পড়ল। আর আমি ঝোঁক বুঝে কোপ মারার মতো অভিসন্ধি নিয়ে গায়েন-বাদ্যকর-দোহারদের পরিচয় লিপিবদ্ধ করি ব্যক্তিগত নোটবুকে।

চারদিক দর্শক-ভক্ত ঘের দেওয়া সে আসরটি বসেছিল উত্তরমুখী হয়ে। সেদিকেই মুখ করে বসেছিল বাদ্যকররা আর সেদিকেই তিন টুকরো ইটের সাহায্যে গাজির আশাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। আর গাজির আশার মাথায় জড়িয়ে রাখা হয়েছিল ফুলের মালা, তসবি এবং দাঁড় করানো আশার পাদদেশে গন্ধ ধোঁয়া বিস্তার করছিল আগরবাতি, আলো ছড়াচ্ছিল মোম।

মূল গায়েনের বাড়ি হচ্ছে সাভার থানার কবিরপুর নবীনগরে। তাঁর নাম ওয়াহেদ আলী। বয়স হবে ষাট বছর। গুরুপরম্পরায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে গাজির গান গেয়ে আসছেন। তাঁর গুরুর নাম এবাদুল্লাহ শাহ। ষোলো বছর বয়সী ঢোলক তৈয়ব আলী ও ত্রিশ বছর বয়সী হারমোনিয়াম মাস্টার লালচানের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর-বন্যাপাড়া গ্রামে, আর দশ বছর বয়সী জুড়িদার আলীম জন্ম-সম্পর্কে মূল গায়েন ওয়াহেদ আলীর নাতি। অতএব, তাঁর বাড়ির সঙ্গে মূল গায়েনের বাড়ির কোনো বিচ্ছেদ নেই। এ তো গেল গায়েন-বাদ্যকরদের পরিচয়। এবার আসা যাক শাহ আলীর মাজারে বসে যাওয়া গাজির গানের আসরের বিবরণ এবং সেদিনের পালাটির কথায়।

চারদিক দর্শক-ভক্ত ঘের দেওয়া সে আসরটি বসেছিল উত্তরমুখী হয়ে। সেদিকেই মুখ করে বসেছিল বাদ্যকররা আর সেদিকেই তিন টুকরো ইটের সাহায্যে গাজির আশাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। আর গাজির আশার মাথায় জড়িয়ে রাখা হয়েছিল ফুলের মালা, তসবি এবং দাঁড় করানো আশার পাদদেশে গন্ধ ধোঁয়া বিস্তার করছিল আগরবাতি, আলো ছড়াচ্ছিল মোম।

রাজা মুসলমানের হাঁক শুনে তাঁদের রাজ্য থেকে বের করে দেন। এতে কালুর অভিশাপে শ্রীরাম রাজার রাজপুরীতে আগুন লেগে যায়। দিশাহারা শ্রীরাম রাজা গত্যন্তর না দেখে অসংখ্য প্রজার সঙ্গে গাজির কাছে ধর্মান্তরিত হন।

মূল গায়েন ওয়াহেদ আলী জানালেন, তিনি মোট পাঁচটি পালায় গাজির গান করে থাকেন। পালাগুলো হচ্ছে ‘গাজির পালা’ বা ‘জন্মপালা’, ‘ফোকরে পালা’ বা ‘বিদায়ের পালা’, ‘বিবাহ পালা’, ‘জুলহাসের পালা’, ‘তাজের মুল্লুক পালা’। তবে গাজির বিদায়ের পালাটি তাঁর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।

এবারে মূল গায়েন ওয়াহেদ বয়াতির ভাষ্যে গাজির গানের কাহিনি-সংক্ষেপ উল্লেখ করি, বৈরাট নগরের রাজা সেকেন্দার যুদ্ধে হারিয়ে বলিরাজ কন্যা অজুপাকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে এক সন্তানের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় জুলহাস। একদিন জুলহাস চলে যায় পাতালপুরে। বৈরাট নগরের রাজা রানি আর এক পুত্রের জন্য আল্লাহর দরবারে কাঁদতে থাকেন। তাঁদের ঘরে আরেক সন্তানের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় গাজি। গাজিকে পেয়ে তাঁরা প্রথম পুত্রের শোক ভুলতে পারেন। এই গাজির বয়স দশ বছর হলে পিতা সেকেন্দার তাঁকে রাজ্যভার নিতে বলেন। গাজি তাতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্রুদ্ধ পিতা তাকে হত্যার জন্য নির্দেশ দেন। গাজি শরণাপন্ন হয় শিক্ষাগুরুর। অতি অলৌকিক ক্ষমতার বলে অগ্নিকুণ্ডু গাজিকে কোনো ক্ষতি করতে পারে না। রাজা অবশেষে স্ব-স্বাক্ষরিত সুই দরিয়ার পানিতে ফেলে দিয়ে গাজির সুই খুঁজে রাখার নির্দেশ দেন। গাজি খোয়াজ খিজিরের সাহায্যে তা–ও এনে দেন। গাজির আর ফকির হওয়ার পথে কোনো বাধা থাকল না। গাজির ফকিরি জাহির করার জন্য মুর্শিদ নিজ মাথার কালো পাগড়ি থেকে আড়াইটি সুতা বের করে হাতের দ্বারা চেপে ধরে কালাচানকে তৈরি করলেন। কারণ, দোসর ছাড়া কোনো কিছু জাহির করা যায় না। ভাই কালুসহ এক রাতে গাজি গোপনে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফকির হয়ে যান। বিভিন্ন দেশ ও দেশান্তরে ঘুরে গাজি-কালু সুন্দরবনে এসে উপস্থিত হন। সেখানকার বাঘ গাজির মুরিদ হয়ে যায়। তারপর গাজি ও কালু ‘আশা’ ভর করে নদী পার হয়ে আসেন শ্রীরামপুরে। ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত দুজন অন্নলাভের আশায় শ্রীরাম রাজার দরবারে উপস্থিত হলেন। রাজা মুসলমানের হাঁক শুনে তাঁদের রাজ্য থেকে বের করে দেন। এতে কালুর অভিশাপে শ্রীরাম রাজার রাজপুরীতে আগুন লেগে যায়। দিশাহারা শ্রীরাম রাজা গত্যন্তর না দেখে অসংখ্য প্রজার সঙ্গে গাজির কাছে ধর্মান্তরিত হন।

কিছুদিন যেতে না যেতেই গাজি-কালু শ্রীরামপুরের নবদীক্ষিত ভক্তদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাত কাঠুরিয়ার বনে চলে যান। গরিব কাঠুরিয়াদের দুর্দশামুক্ত করার জন্য গাজি-কালু গঙ্গীর কাছে স্বর্ণের আবেদন জানান। স্বর্ণ পেলে বায়ান্ন হাজার পরিকে দিয়ে বনের মধ্যে গাছ কেটে সহস্র দালান ও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। পরিরা চলে যেতেই গাজি-কালু দুই ভাই পুরীটা ঘুরে ঘুরে দেখে নাম রাখেন সোনাপুর শহর। এই সোনাপুর শহরে মসজিদের পালঙ্কে গাজি ঘুমাচ্ছিলেন। এর মধ্যে কুকাফ থেকে ছয় পরি ঘুরতে আসে সোনাপুর। গাজির রূপ দেখে তারা মোহিত হয়ে ওঠে। বহু বাগ্বির্তকের মধ্যে পরিরা গাজির জন্য যোগ্য নারী হিসেবে ব্রাহ্মণ্য নগরের মুকুট রাজার কন্যা চম্পাবতীকে মনোনীত করে। যথাসময়ে গাজির পালঙ্ক নিয়ে পরিরা উড়াল দেয় ব্রাহ্মণ্য নগরে। ব্রাহ্মণ্য নগরে পৌঁছে পরিরা চম্পাবতীর পাশে গাজিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। ঘুমের ঘোরে গাজির হাত পড়ে চম্পাবতীর বুকে। সঙ্গে সঙ্গে চম্পাবতীর ঘুম ভেঙে যায়। প্রথম দর্শনেই গাজির রূপে বিমোহিত হয়ে যায়। পরিচয় হয় তাদের দুজনের। সে মুহূর্তে চম্পাবতী নিজ ভাগ্যগুণে দেখে গাজিই তার স্বামী। মুখের পান বদল ও হাতের আংটি বদল করে তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দুজনে আবার নিদ্রায় গেলে পরিরা গাজিকে নিয়ে সোনাপুর চলে আসে। এরপর ঘুম ভেঙে গেলে গাজি চম্পাবতীর জন্য পাগল হয়ে যায়।

অবশেষে সে কালুকে দিয়ে ব্রাহ্মণ্য নগরের রাজার কাছে কন্যা চম্পাবতীর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠায়। কালু বন্দী হয় মুকুট রাজার হাতে। গাজি জানতে পেরে বনের বাঘ নিয়ে যুদ্ধে নেমে যায় দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে। শুরু হয় বাঘ আর গঙ্গার দেওয়া কুমিরের লড়াই। মুকুট রাজের শক্তির কাছে গাজি প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। গাজি গো-মাংস দিয়ে মুকুট রাজার মৃত্যুজীবী কূপ ধ্বংস করে। আর আশা ও খড়ম দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গাজি মুকুট রাজাকে পরাজিত করে। পরাজিত রাজা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং গাজি–চম্পাবতীর বিয়ে দেয়। রাজপুরীতে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর গাজি, কালু ও চম্পাবতী পাতালপুরে গিয়ে জুলহাসকে নিয়ে বৈরাট নগরে পিতা–মাতার কাছে চলে আসেন। এভাবেই তাঁদের মধ্যে সুখের মিলন হলো।

এই হচ্ছে গাজির পালার আসল কাহিনি। কিন্তু পালা পরিবেশনার সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে গায়েনরা কাটছাঁট করে গাজির গান গেয়ে থাকেন। যেমন শাহ আলীর মাজারে পরিবেশিত গাজির গানে মূল গায়েন ওয়াহেদ আলী মূলত গাজির প্রতি ভক্তি নিবেদনার্থে নিজের মতো করে পালা পরিবেশনা করে থাকেন। তাঁর পরিবেশিত পালাতে তাই নিরালম্ব কোনো কাহিনির পরিবর্তে খণ্ড খণ্ড আখ্যানভাগের চলনটাই থাকে বেশি।