সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি। সেবার মান বাড়াতে নার্স ও মিডওয়াইফ নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) এসব পদের চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এর আওতায় ১০ম গ্রেডের ১ হাজার ৫৬৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং ৯১৪ জন মিডওয়াইফ সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে।

তবে স্বাস্থ্য খাতের জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের নিয়োগ দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে ছিল প্রায় সাত মাস। অন্যদিকে মিডওয়াইফ পদের চাহিদাপত্রটি সম্প্রতি পিএসসিতে পাঠানো হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক এই প্রশাসনিক বিলম্ব দ্রুত কাটিয়ে চূড়ান্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তাগিদ দিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা।

সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগে ৭ মাসের ধীরগতি

উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সিনিয়র স্টাফ নার্সের তীব্র শূন্যতা রয়েছে। এ সংকট মেটাতে ১ হাজার ৫৬৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল প্রায় সাত মাস আগে। কিন্তু তথ্যের অসংগতির কারণে এ প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।

নিয়োগপ্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব (নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অনুবিভাগ) খুরশীদ আলম। তিনি জানান, ‘আমি অল্প দিন হলো এই পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। সিনিয়র স্টাফ নার্স পদে নিয়োগের জন্য চলতি বছরের ২৪ মার্চ পিএসসিতে প্রথম চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সে সময় পিএসসি চিঠি দিয়ে জানায় যে পদসংখ্যা ও আনুষঙ্গিক তথ্যে কিছু অসংগতি রয়েছে।’

এই দাপ্তরিক ভুল সংশোধনে প্রায় সাত মাস সময় লেগে যাওয়া নিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতিকেই দায়ী করছেন চাকরিপ্রার্থীরা।

সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়ে উপসচিব খুরশীদ আলম বলেন, ‘আমরা পদসংক্রান্ত সব জটিলতা নিরসন করেছি। ৭ অক্টোবর ১ হাজার ৫৬৬টি শূন্য পদের বিপরীতে সংশোধন করা নতুন চাহিদাপত্র পুনরায় পিএসসিতে পাঠানো হয়েছে।’

মিডওয়াইফের ৯১৪ পদে নতুন আবেদন

সিনিয়র স্টাফ নার্সের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে মাতৃ ও নবজাতক সেবার জন্য ১০ম গ্রেডের ৯১৪ জন মিডওয়াইফ নিয়োগের নতুন চাহিদাপত্র পিএসসিতে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন হাসপাতালে মিডওয়াইফের ১ হাজার ১৫টি অনুমোদিত পদ শূন্য রয়েছে। বিধি অনুযায়ী ১০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করে বাকি ৯১৪টি পদের চাহিদাপত্র ৫ অক্টোবর পিএসসিতে পাঠিয়েছে নার্সিং সেবা-১ শাখা।

মাঠপর্যায়ে এই নিয়োগ কার্যক্রমের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ১১ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে মিডওয়াইফারি–সংক্রান্ত এক গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি গর্ভবতী মা ও নবজাতকের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও জীবনরক্ষাকারী সেবা নিশ্চিত করতে মিডওয়াইফরা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেন। পর্যায়ক্রমে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মিডওয়াইফদের পেছনে অর্থ ব্যয় কোনো খরচ নয়; বরং মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানোর কার্যকর জাতীয় বিনিয়োগ।’ বৈঠকে তিনি আরও জানান, কেবল নিয়োগেই সীমাবদ্ধ না থেকে মিডওয়াইফদের দক্ষতা বাড়াতে দেশের ৬২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো রূপান্তর এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকার প্রথাগত ‘চিকিৎসাকেন্দ্রিক’ ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ‘রোগ প্রতিরোধভিত্তিক’ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা (জিডিপির ১.০১ শতাংশ) করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নার্সিং চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘সরকার হাজার হাজার কর্মী নিয়োগের কথা বললেও দাপ্তরিক ভুল সংশোধনেই যদি ছয়-সাত মাস কেটে যায়, তবে চূড়ান্ত নিয়োগ পেতে কত বছর লাগবে? আমরা চাই, সরকারের এই ভালো উদ্যোগগুলো যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে না থাকে।’

পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, পিএসসির নিয়ম ও চেকলিস্ট অনুযায়ী ফাইল নিখুঁত হওয়া জরুরি। প্রয়োজনীয় তথ্যাদি যাচাই–বাছাই শেষে বিধিসম্মতভাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বাস্থ্য খাতে নীতি নির্ধারণ ও বরাদ্দ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক কাজেও গতি আনা জরুরি। ১ হাজার ৫৬৬ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স এবং ৯১৪ জন মিডওয়াইফ নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলে স্বাস্থ্য খাতে জনবলসংকট কিছুটা কমবে।