সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ চায় বিএনপি, তবে তারা অংশ না নিলেও প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অন্যদিকে সংবিধানকে টেকসই ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য করতে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কমানো এবং ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে শিক্ষাবিদদের সঙ্গে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটি মতবিনিময় সভা করেছে। ওই সভাতে এসব বিষয় উঠে এসেছে। বিশেষ কমিটি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করছে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ। বিরোধী দল অংশ না নিলে সংবিধান সংশোধনে বিতর্ক হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিতর্ক তৈরি হবে কি না জানি না, তবে বিতর্ক করার একটা সুযোগ থাকবে। আমরা সব সময় আহ্বান জানাব, বিরোধী দল যেন আমাদের সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের মতামত দেয়।’
সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে আনা হলে বিরোধী দল অংশ নেবে, এমন আশা প্রকাশ করে বিশেষ কমিটির সভাপতি বলেন, তারা যদি তাদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন না করে, সেটা জাতি দেখবে। তবে বিএনপি তাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে।
শিক্ষাবিদদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক অত্যন্ত সমৃদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ ও জ্ঞানগর্ভ ছিল উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকেরা সংবিধানের বিভিন্ন অংশে কী কী বিষয় প্রতিফলিত হওয়া দরকার, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অথচ জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন—এমন বিষয় নিয়েও তাঁরা মতামত দিয়েছেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানের ব্যাখ্যা এবং মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিষয়ে বিচার বিভাগের এখতিয়ার কী হবে, তা সাংবিধানিকভাবে নির্ধারণের ওপর আলোচকেরা গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর খবরদারি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ বিষয়ে শিক্ষাবিদদের অনেকে লিখিত মতামত দেবেন। তবে বৈঠকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি।
সংবিধানে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, উচ্চকক্ষে কোন কোন শ্রেণি বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা যায় কি না—এসব বিষয়ে মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা।
বৈঠক সূত্র জানায়, একজন শিক্ষাবিদ স্বৈরতন্ত্র বন্ধ করা সংবিধানের মূল বিষয় হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগের প্রধানের যে ক্ষমতা, তা কমানোর প্রয়োজন বলে মত দেন। এ ছাড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য উচ্চ আদালত থেকে পৃথক সাংবিধানিক আদালত গঠন করা, সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতে বদল আনার প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ। সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় সমাজের উচ্চ শ্রেণির মতামতের ওপর সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন নিশ্চিত করার কথাও এসেছে বৈঠকে।
বৈঠক শেষে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, শতভাগ ঐকমত্য সম্ভব নয়। তবে যত বেশি ঐকমত্য হবে, সংবিধান তত বেশি টেকসই ও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। গোয়েন্দা বাহিনীসহ রাষ্ট্রের যেসব সংস্থার বল প্রয়োগের ঘটনা জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থাও সংবিধানে থাকা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দীন খান বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থায় বারবার সংকট তৈরির পেছনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বৈষম্যমূলক রাজনীতি এবং ‘বিজয়ী সবকিছু পাবে’ নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা রাষ্ট্রকে স্বৈরতান্ত্রিক করে তোলে।
অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে তাঁরা বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মধ্যে কিছু আইনের সংশোধনসংক্রান্ত। এ ছাড়া সংবিধানে ‘মহিলা’ শব্দের পরিবর্তে ‘নারী’, ‘উপজাতি’র পরিবর্তে ‘ভিন্ন জাতিসত্তা’ এবং ‘উপসম্প্রদায়ের’ পরিবর্তে ‘ধর্মীয় সম্প্রদায়’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ও সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন সলিমুল্লাহ খান, গীতি আরা নাসরিন, সামিনা লুৎফা, মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, কে এইচ লুৎফুল এলাহী, আবদুল্লাহ আল মামুন, একরামুল হক, আবদুল লতিফ মাসুম, শামীমা সুলতানা, কাজী মো. মাহবুবুর রহমান, মোহাম্মদ একরামুল হক, নেসার ইউ আহমেদ প্রমুখ।
২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট সংবিধান–বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী আলোচনার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।