যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে লক্ষ্য করে করা হয়রানি ও হেনস্তার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার পরিষদের ১২ জন উপদেষ্টা। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে তারা এই অগ্রহণযোগ্য ঘটনার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন।

ঘটনাটি গত সোমবার (১২ অক্টোবর) ঘটেছিল। জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে হুইলচেয়ারে করে বের হওয়ার সময় অধ্যাপক ইউনূসকে হেনস্তা করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি অধ্যাপক ইউনূসের দিকে এগিয়ে গিয়ে উচ্চস্বরে স্লোগান দিচ্ছেন। বিক্ষোভকারীরা তাকে উদ্দেশ্য করে ‘হোয়াই ইউ কাম হিয়ার’সহ বিভিন্ন অপবাদসূচক কথা বলে চিৎকার করছিলেন। অভিযোগ উঠেছে যে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রবাসী সমর্থক তাকে এভাবে হেনস্তা করেছেন।

এই বিবৃতির সঙ্গে যুক্ত সাবেক উপদেষ্টারা হলেন— সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সিআর আবরার, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান খান, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সাখাওয়াত হোসেন, ফারুক-ই-আজম, ফরিদা আখতার, শারমিন এস মুরশিদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে লক্ষ্য করে অব্যাহত হয়রানি, অনলাইনে অপপ্রচার এবং পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনায় আমরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছি ও কঠোরতম নিন্দা জানাচ্ছি।’

সাবেক উপদেষ্টারা তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেন, ‘বছরের পর বছর লাগামহীন অর্থনৈতিক লুটপাট, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধসে পড়া ও দুর্নীতি, পদ্ধতিগত দমন-পীড়ন এবং ব্যাপক পরিসরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আমাদের দেশ যখন বিপর্যস্ত হয়ে পুরোপুরি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল, সেই সময় দেশ পুনর্গঠনের অত্যন্ত কঠিন কাজ সামলাতে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এই অন্তর্বর্তী সরকারই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটিয়েছিল, যেগুলো ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নিয়মিত ঘটানো হতো।’

বিবৃতিতে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলের ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার রক্ষার কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলবে।

১২ উপদেষ্টার সমন্বিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গভীর অনুতাপের সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, কিছু রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিয়মিতভাবে অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার ও ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে এবং তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার হুমকি দিচ্ছে। আমরা এমন কাপুরুষোচিত কৌশলের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি, যেগুলো অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।’

তারা আরও দৃঢ়তার সাথে জানান, ‘আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, যতই ভয় দেখানো হোক, মিথ্যাচার, অনলাইনে হয়রানি বা ব্যক্তিগত হুমকি দেওয়া হোক, তাতে জুলাই প্রতিশ্রুতির পরিবর্তনগুলোর প্রতি আমাদের সংকল্প একটুও টলবে না।’

পরিশেষে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ ও তরুণদের বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে সংস্কার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে ঐতিহাসিক জনসমর্থন অর্জিত হয়েছে, তা ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকদের বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার ও অপচেষ্টায় মুছে ফেলা সম্ভব হবে না।’