আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির নতুন নীতিমালা জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার প্রকাশিত এই নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে। তবে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শূন্য আসনে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাক্রম যাচাই করে বাছাই করা হবে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির আবেদনের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পছন্দক্রম হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন। তবে যেসব বিদ্যালয়ে দুই পালায় (ডাবল শিফট) কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেখানে আবেদনকারী যদি উভয় পালা পছন্দ করেন, তবে তা দুটি আলাদা বিদ্যালয় পছন্দ করার সমান হিসেবে গণ্য হবে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির এই ডিজিটাল লটারি প্রক্রিয়ার যাবতীয় কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শূন্য আসনে ভর্তির জন্য লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করা হবে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থী বাছাই করা হবে। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা হবে ৫০ নম্বরের এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা হবে ১০০ নম্বরের।

উল্লেখ্য যে, গত মার্চ মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা করেছিলেন যে, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। তাদের মতে, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির বদলে পরীক্ষা চালু হলে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ বাড়বে। এছাড়া কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীলতা নতুন করে শুরু হতে পারে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে। ইতিমধ্যে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে কোচিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য লটারি পদ্ধতিই বহাল থাকবে এবং কেবল ওপরের শ্রেণিতে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লটারি পদ্ধতি বজায় রাখা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির জন্য লটারি এবং বাকিদের জন্য পরীক্ষার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়।

এক সময় ভর্তি পরীক্ষার নামে খুব অল্প বয়সেই শিশুদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। নামী বিদ্যালয়ে সন্তান ভর্তি করার জন্য অনেক পরিবার কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ত, যা ছিল সাধারণ ঘটনা। পাশাপাশি ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল প্রবল। ফলে দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো বিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত, যা নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘকাল ধরে সমালোচনা চলেছিল।

এই প্রেক্ষাপটেই প্রথমে প্রথম শ্রেণিতে লটারি পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি থাকা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি বাধ্যতামূলক করা হয় এবং পরের বছর থেকে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও এই নিয়ম কার্যকর হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত তখনো পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি করা হতো। পরবর্তীতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা শুরু হয় এবং সেই পদ্ধতিটিই অব্যাহত ছিল। এবার সেই নিয়মে পরিবর্তন এনে পুনরায় ওপরের শ্রেণিতে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হলো।