দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল সোমবার সকাল আটটা থেকে আজ সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এই ছয়জনের মৃত্যু ঘটে। এর ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬ জনে। এছাড়া নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০৪ জন। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০ জনে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ইতিহাসে হামের কারণে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত এই পরিসংখ্যানে আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে রোগতত্ত্ববিদদের মতে, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, যদিও শিশুরা এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু ঘটে, সেগুলোকে হামে মৃত্যু হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
আজকের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে যে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ১ হাজার ৭৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত রোগীর মোট সংখ্যা ২ লাখ ৭ হাজার ৩৭১ জনে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৩৯ জন। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ২২ হাজার ৭১২ রোগীর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত করা হয়েছে।
হাসপাতালের তথ্যানুসারে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছেড়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে হামের উপসর্গে যে ছয়জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের, একজন সিলেট বিভাগের এবং দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৮ বছর আগে পর্যন্ত মৃত্যু তো দূরে থাক, হামে সংক্রমণের সংখ্যা বছরে ৪০০-র বেশি হতো না। এই ইতিবাচক পরিস্থিতির কারণে ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং ২০২৬ সালে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নিয়েছে।
যে রোগটি একসময় প্রায় বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল, তা এখন হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকা দেওয়ার কাজে চরম অবহেলা করা হয়েছে এবং এটিই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
চলতি বছরের শুরু থেকেই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও সেদিকে যথাযথ নজর দেওয়া হয়নি। গত মার্চ মাস থেকে রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, কিন্তু চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও সেই সময়ে প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়।