সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখতে এবার ২০০ কোটি দিরহাম (৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা) মূলধন সহায়তার ‘দৃঢ় প্রতিশ্রুতি’ প্রদান করেছে বাংলাদেশ সরকার। এর আগে ওই দেশে ব্যাংকের কার্যক্রমের মূলধন ঘাটতি পূরণে এক হাজার কোটি টাকার বেশি (৩০ কোটি দিরহাম) অর্থ জোগান দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই পরিমাণ অর্থ দিয়ে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সন্তুষ্ট না হওয়ায় জনতা ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে সরকারকে মূলধন জোগানের শর্ত দেওয়া হয়। সেই প্রেক্ষিতেই সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় জনতা ব্যাংককে প্রয়োজনীয় মূলধন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সম্প্রতি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে মূলধন সহায়তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মূলধন জোগানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, পরিশোধিত মূলধনের প্রয়োজনীয় মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশটিতে জনতা ব্যাংকের শাখাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, সেখানে জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৪০ কোটি দিরহাম থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ছিল মাত্র ১০ কোটি দিরহাম। এই সংকট নিরসনে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পর গত সেপ্টেম্বরে সরকার জনতা ব্যাংককে ইউএইতে ৮ কোটি ১৬ লাখ ৭৭ হাজার ১০৪ মার্কিন ডলার পাঠানোর নির্দেশ দেয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ৩ কোটি টাকার সমান। সরকারের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের ফলে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল আইনে অবস্থিত জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সুযোগ পায়। উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সাল থেকে ব্যাংকটি সেখানে প্রবাসীদের সেবা প্রদান করে আসছে।
সূত্রমতে, সরকার মূলধনের জোগান দিলেও দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। তাদের দাবি ছিল, জনতা ব্যাংকের মূল আর্থিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয় এবং ব্যাংকটি বড় ধরনের ঘাটতির মুখে রয়েছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার স্বাক্ষরিত একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতিপত্র ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, “জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও সার্বিক মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে সরকার সর্বোচ্চ ২০০ কোটি দিরহাম বা সমপরিমাণ অর্থসহায়তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।” বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি।
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে নির্ধারিত আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থসচিবের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ইউএইতে বসবাসরত কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি জনতা ব্যাংকের চারটি শাখার মাধ্যমে নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রেরণ, সঞ্চয়ী হিসাব পরিচালনা এবং ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে বিনিয়োগ করে আসছেন। এছাড়া দুই দেশের মধ্যকার আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং বাণিজ্যিক ঋণ প্রদানেও এই শাখাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রবাসীদের এই সেবামূলক কার্যক্রম এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সুরক্ষিত রাখতেই সরকার এই বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ব্যাংকের স্থানীয় কার্যক্রম যেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধান মেনে সুরক্ষিত ও স্থিতিশীল থাকে, সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছে।