জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো সমগ্র পৃথিবীর আবহাওয়া ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে থাকে। বছরের শেষ পর্যায়ে এসে মহাসাগরগুলো থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু জলবায়ু সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সম্প্রতি সতর্ক করে জানিয়েছে, “এল নিনো আরও তীব্র হয়ে ডিসেম্বর নাগাদ এর চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।” এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন সেই ঘটনাকে এল নিনো বলা হয়। এটি মূলত এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন নামক একটি বৃহত্তর জলবায়ু চক্রের অংশ, যা এল নিনো, লা নিনা এবং নিরপেক্ষ অবস্থার মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়। সাধারণত এল নিনো চলাকালীন ট্রেড উইন্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় উষ্ণ উপরিভাগের পানিকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনের ধরনে পরিবর্তন আনে। অন্যদিকে, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন অতিরিক্ত তাপ আটকে ফেলে এবং পৃথিবীর এই অতিরিক্ত তাপের সিংহভাগই শোষণ করে নেয় মহাসাগরগুলো। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা চরম আবহাওয়া ও সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
মহাসাগর পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক সময়ে এক বড় সাফল্য অর্জন করেছেন। নেচার জিওসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে সমুদ্রের স্রোতের মানচিত্র তৈরির এক নতুন পদ্ধতির কথা জানানো হয়েছে। জিওস্টেশনারি ওশান ফ্লো বা জিওফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চ স্থানিক ও সময়গত রেজোল্যুশনে সমুদ্রের উপরিভাগের স্রোতগুলোকে পুনর্গঠন করা হয়। আটলান্টিক মহাসাগরের গালফ স্ট্রিমের ওপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিজ্ঞানীরা ছোট আকারের স্রোতগুলোর বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করেছেন। এই স্রোতগুলো মূলত তাপ, পুষ্টি উপাদান এবং কার্বনের আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে। এই উন্নত পর্যবেক্ষণ–ব্যবস্থা জলবায়ু মডেলের অনিশ্চয়তা কমাতে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশসহ সমুদ্রতীরবর্তী বিভিন্ন জনবহুল দেশ প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের মিথস্ক্রিয়ার পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা পার্থক্যের সঙ্গে যুক্ত জলবায়ু বিন্যাস বা ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোলের প্রভাবও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস ইঙ্গিত করছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। তবে ২০২৭ সালের বৈশ্বিক জলবায়ুর সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন, কারণ বৈশ্বিক অনুমানের মার্জিন অত্যন্ত কম। এল নিনো ২০২৭ সালের শুরুতে জলবায়ুর ওপর একটি প্রধান প্রভাবক হিসেবে বজায় থাকবে। তবে এর চূড়ান্ত প্রভাব মূলত মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক বিবর্তনের ওপর নির্ভর করবে।