বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান আর আমাদের মাঝে নেই। গতকাল রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। ১৯৫৯ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে ষাটের দশকে ঢাকা ও লাহোরের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর সমসাময়িক অভিনেত্রী শবনমের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের এক নিবিড় বন্ধুত্ব ছিল। যদিও অভিনয়জীবনে তাঁরা মাত্র একটি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। নাসিমা খানের প্রয়াণের পর তাঁর অভিনয় প্রতিভা, দীর্ঘদিনের সেই বন্ধুত্ব এবং শেষ জীবনের চাপা বেদনার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে কথা বলেছেন বরেণ্য অভিনেত্রী শবনম।

স্মৃতিচারণ করে শবনম বলেন, “আমরা কাছাকাছি সময়ে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেছি। দুজনেরই পুরান ঢাকায় বাড়ি। বেবী ইসলাম পরিচালিত ‘তানহা’ একমাত্র সিনেমা, যেটিতে আমরা কাজ করেছি। সেই ছবিতেও পর্দায় আমাদের একসঙ্গে দেখা যায়নি। তবে একত্রে কাজ না করলেও শুটিংয়ে আমাদের দেখা হতো, আড্ডা হতো। আমাদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ও আমার বাসায় আসত, আমিও ওর বাসায় যেতাম। বণত, ‘ঝর্ণা, আসতেছি তোর বাসায়।’ আমিও বলতাম, আইসা পড়ো। আমাদের সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো একে অপরকে তুই–তোকারি করেও কথা বলতাম।”

নাসিমা খানের ক্যারিয়ার নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে শবনম মনে করেন, তাঁর মতো একজন দক্ষ অভিনয়শিল্পীর আরও উচ্চতর অবস্থানে থাকার কথা ছিল। তবে কেন তিনি সেই সুযোগ-সুবিধাগুলো কাজে লাগাতে পারেননি, তা শবনমের কাছে স্পষ্ট নয়। এই বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, ওর মানের অভিনয়শিল্পীর আরও ভালো অবস্থানে থাকার কথা ছিল। কিন্তু কেন জানি, ঠিক সেভাবে সুযোগ-সুবিধা করে উঠতে পারেনি। কেন পারেনি, সেটা আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। নাসিমাকে সেভাবে গাইড করার মতো কেউ ছিল কি না, জানি না। আমার মনে হয়, একজন শিল্পীর প্রতিভা থাকলেই হয় না, গাইড করার মতো ঠিকঠাক মানুষেরও দরকার। সে জায়গায় হয়তো পিছিয়ে ছিল নাসিমা।”

আশির দশকের শেষ দিকে দেশে ফেরার পর নাসিমা খানের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ শুরু হয় শবনমের। এরপর তাঁদের মধ্যে নিয়মিত কথা হতো। কয়েক মাস আগে নাসিমা খান আমেরিকায় অবস্থান করছিলেন এবং দেশে ফেরার পরও তাঁদের কথা হয়েছে। বিশেষ করে নাসিমা খানের ছোট ছেলের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনেকবার আলোচনা হয়েছে। সেই শোকের গভীরতা সম্পর্কে শবনম বলেন, “ছেলেটাকে নিয়ে ওর কষ্টটা কত গভীর ছিল, পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। তবে অসুস্থ ছেলেকে হারানোর কষ্টটা যে ওকে ভেতরে ভেতরে তাড়িয়ে বেড়াত, সেটা বুঝতে পারতাম। এর বাইরে নিজের দুঃখ কিংবা আক্ষেপ নিয়ে ওকে খুব একটা কথা বলতে শুনিনি।”